বিদ্যুৎ এখন শুধু ঘরের আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। শিল্প, চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি—সবকিছুই আজ নির্ভর করছে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ। তাই এমন জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, যা একদিকে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ দিতে পারে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও তুলনামূলকভাবে কম রাখে। এই আলোচনার কেন্দ্রে আবারও উঠে এসেছে পারমাণবিক শক্তি।
পারমাণবিক শক্তি আসলে পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে পাওয়া শক্তি। একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত। এই কেন্দ্রের ভেতরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা থাকে। সেই শক্তি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মুক্ত করা গেলে তা তাপ তৈরি করে। আর সেই তাপ ব্যবহার করেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পদ্ধতিটি শুনতে জটিল মনে হলেও মূল ধারণাটি সহজ: তাপ তৈরি করা, সেই তাপ দিয়ে বাষ্প বানানো, বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো, আর টারবাইনের সাহায্যে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। ব্যবহারকারীর দেওয়া লেখায়ও এই ব্যাখ্যাটি একই মূল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের দুটি প্রধান বৈজ্ঞানিক পথ আছে। একটি হলো নিউক্লিয়ার ফিশন, আরেকটি নিউক্লিয়ার ফিউশন। বর্তমানে বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তা মূলত নিউক্লিয়ার ফিশনের ওপর নির্ভরশীল। ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার ব্যাখ্যাতেও বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিশনকে ব্যবহৃত পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নিউক্লিয়ার ফিশন বলতে বোঝায় এমন একটি বিক্রিয়া, যেখানে একটি ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে দুই বা ততোধিক ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয়। এই বিভাজনের সময় তাপ ও তেজস্ক্রিয়তার আকারে শক্তি বের হয়। উদাহরণ হিসেবে ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর কথা বলা যায়। যখন একটি নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করে, তখন সেটি ভেঙে ছোট নিউক্লিয়াস তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আরও দুই বা তিনটি নিউট্রন বের হয়। এই নতুন নিউট্রনগুলো আবার আশপাশের অন্য ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুকে আঘাত করে। ফলে একটির পর একটি বিভাজন ঘটতে থাকে। এই ধারাবাহিক ঘটনাকেই বলা হয় চেইন রিঅ্যাকশন।
এই চেইন রিঅ্যাকশনই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল শক্তির উৎস। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ন্ত্রণ। একই প্রক্রিয়া যদি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ঘটে, তাহলে তা ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরে এই বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিতভাবে চালানো হয়। অর্থাৎ, কত দ্রুত বিভাজন হবে, কত তাপ উৎপন্ন হবে, কীভাবে তাপ সরানো হবে—সবকিছু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ কারণেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ওপর নয়, কঠোর প্রকৌশল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভর করে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রিঅ্যাক্টর হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে জ্বালানি হিসেবে সাধারণত ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহৃত হয়। ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ শীতলীকরণ এজেন্টকে উত্তপ্ত করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই শীতলীকরণ এজেন্ট হিসেবে পানি ব্যবহৃত হয়। পানি উত্তপ্ত হয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। এরপর সেই বাষ্প উচ্চচাপে টারবাইনের দিকে পাঠানো হয়। বাষ্পের ধাক্কায় টারবাইন ঘোরে, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ তৈরি করে।
এই দিক থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কয়লা, গ্যাস বা তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি মিল আছে। সব ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত তাপ থেকে বাষ্প, বাষ্প থেকে যান্ত্রিক শক্তি, আর যান্ত্রিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। পার্থক্য হলো তাপের উৎসে। কয়লা, গ্যাস বা তেলচালিত কেন্দ্র জ্বালানি পোড়ায়। পারমাণবিক কেন্দ্র তাপ পায় পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজন থেকে। এই কারণেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার সময় কার্যত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে না বলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা উল্লেখ করে।
পারমাণবিক জ্বালানির আলোচনায় ইউরেনিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইউরেনিয়াম একটি ধাতু, যা পৃথিবীর বিভিন্ন শিলা ও পাথরের মধ্যে পাওয়া যায়। তবে সব ইউরেনিয়াম একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারযোগ্য নয়। ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ আছে। আইসোটোপ বলতে একই মৌলের এমন ভিন্ন রূপকে বোঝায়, যাদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রায় একই হলেও ভর ও ভৌত বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য থাকে। ইউরেনিয়ামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগই ইউরেনিয়াম-২৩৮। কিন্তু এটি কার্যকর চেইন রিঅ্যাকশন চালানোর জন্য উপযুক্ত নয়। অন্যদিকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করতে পারে। সমস্যা হলো, প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বিশ্বের মোট ইউরেনিয়ামের ১ শতাংশেরও কম। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের আগে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো হয়, যাতে তা রিঅ্যাক্টরে কার্যকরভাবে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
একবার সমৃদ্ধ করা হলে এই জ্বালানি সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ব্যবহারের পর জ্বালানিটি নিরাপদ হয়ে যায় না। বরং এটি তখনও তেজস্ক্রিয় থাকে। তাই ব্যবহৃত জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল সংরক্ষণ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির জন্য কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। মানুষ, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো পারমাণবিক জ্বালানি চক্র। এই চক্র শুরু হয় খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের মাধ্যমে। এরপর আসে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সমৃদ্ধকরণ, জ্বালানি তৈরি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার, ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ শুধু রিঅ্যাক্টরের ভেতরের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে একটি দীর্ঘ শিল্প, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা কাঠামো জড়িত।
পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ স্বাভাবিক। কারণ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ভুলভাবে ব্যবস্থাপনা করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সব পারমাণবিক বর্জ্য একই ধরনের নয়। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ও প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হয় এবং ভিন্নভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়। চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প এবং পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর—সব ক্ষেত্র থেকেই কিছু তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হতে পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট বর্জ্যের মধ্যে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠোর হওয়া দরকার।
এই জায়গাতেই পারমাণবিক শক্তি নিয়ে দ্বিমুখী আলোচনা তৈরি হয়। একদিকে এটি বড় পরিসরে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ দিতে পারে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্যত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে না। অন্যদিকে ব্যবহৃত জ্বালানি, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নির্মাণ ব্যয় এবং জনআস্থা—এসব প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই পারমাণবিক শক্তিকে এককথায় ভালো বা খারাপ বলা যায় না। বরং এটি একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি, যার সফলতা নির্ভর করে বিজ্ঞান, নিরাপত্তা, নীতি, অর্থনীতি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরগুলো বিশ্বের মোট স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করে। একই সংস্থা আরও জানায়, পারমাণবিক শক্তি বিশ্ব বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশের যোগান দেয়। এই তথ্যগুলো দেখায়, পারমাণবিক শক্তি এখনো বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে কম কার্বনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে।
জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনেও পারমাণবিক শক্তি ও প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা সেখানে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারমাণবিক সমাধান তুলে ধরেছে। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, পারমাণবিক বিজ্ঞান শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং দূষণ কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। আগামী প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উন্নত রিঅ্যাক্টর বলা হয়। এগুলোর লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা বাড়ানো, বর্জ্য কমানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকে আরও নমনীয় করা। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ ধরনের রিঅ্যাক্টর নির্মাণের কাজ শুরু হতে পারে। তবে এই আশাবাদ বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, অর্থায়ন, নিরাপত্তা অনুমোদন এবং জনআস্থা—সবকিছুই নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে পারমাণবিক শক্তি হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যা একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় এবং সংবেদনশীল। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কম কার্বনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় উৎস হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি ও দায়িত্বও বড়। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু উৎপাদন ক্ষমতা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা নির্ভরযোগ্য, খরচ কতটা বাস্তবসম্মত এবং জনগণের কাছে তথ্য কতটা স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো হচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তিকে বুঝতে হলে ভয় বা অন্ধ সমর্থনের জায়গা থেকে নয়, জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার জায়গা থেকে এগোতে হবে। কারণ পরমাণুর ভেতরের শক্তি বিশাল। সেই শক্তি মানবকল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব, তবে তা করতে হলে বিজ্ঞানের সঙ্গে দায়িত্ববোধের সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সিভি/এইচএম

