ইরানের রাজনীতিতে বড় ধরনের এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো দীর্ঘ সময় ধরে একজন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, এমনকি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই শেষ কথা বলতেন সেই নেতা। কিন্তু ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সালের পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই পুরোনো কাঠামো আর আগের মতো কাজ করছে না।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটি কয়েক দিন সর্বোচ্চ নেতা ছাড়া ছিল। পরে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও বাস্তবে তাঁর ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে বলে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরিচিত একাধিক সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে এখন আগের মতো একক কোনো ধর্মীয় নেতৃত্ব নেই। বরং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ক্রমেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে সামনে চলে এসেছে। সামরিক কৌশল, নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান—এসব ক্ষেত্রে বাহিনীটির প্রভাব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
মোজতবা খামেনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা হলেও তাঁর প্রকাশ্যে না আসা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই তিনি জনসমক্ষে আসছেন না। সীমিত অডিও যোগাযোগ বা আইআরজিসির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিনি বার্তা আদান-প্রদান করছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও ইরানের ভেতরে ও বাইরে পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, তিনি সরাসরি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না; বরং সামরিক নেতৃত্বের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো অনুমোদন করার ভূমিকায় আছেন।
এখানেই ইরানের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। একসময় সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন নীতিনির্ধারণের শেষ ও প্রধান কেন্দ্র। এখন সেই জায়গায় যুদ্ধকালীন সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ জেনারেলদের হাতে কার্যত সিদ্ধান্তের লাগাম চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা, যিনি শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতার বিষয়ে অবগত, বলেছেন—ইরানের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসতে এখন অস্বাভাবিকভাবে বেশি সময় লাগছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া পেতে ২ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। এটি ইঙ্গিত করে, আগের মতো একজন নেতা দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন—এমন কাঠামো এখন আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের এই ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তেহরান এখন এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে সামরিক চাপ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং উপসাগরীয় জাহাজ চলাচল—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক নয়, সামরিক হিসাব-নিকাশের ওপরও নির্ভর করছে।
গত সোমবার ইরান ওয়াশিংটনের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রগুলোর মতে, ওই প্রস্তাবে ধাপে ধাপে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। তবে ইরান স্পষ্টভাবে চাইছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ না মেটা পর্যন্ত পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার বাইরে থাকুক। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান ঠিক বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্র চায়, পারমাণবিক ইস্যুই আলোচনার কেন্দ্রে থাকুক।
এই অবস্থানগত ব্যবধানই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ারের মতে, দুই পক্ষের কেউই এখন ছাড় দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। ইরান মনে করছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব খাটিয়ে তারা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়াতে পারবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
অ্যালান আইয়ার আরও মনে করেন, আইআরজিসি এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুর্বলতার কোনো ইঙ্গিত দিতে চাইবে না। কারণ বাহিনীটির ক্ষমতা এখন শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। ফলে দুই পক্ষই অপেক্ষা করছে—সময়ের সঙ্গে প্রতিপক্ষ আগে দুর্বল হয় কি না।
ইরানের ভেতরের এই ক্ষমতার পরিবর্তনকে শুধু সাময়িক যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামরিক প্রভাবের প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়। আইআরজিসি বহু বছর ধরেই ইরানের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আঞ্চলিক নীতি এবং বিদেশি অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু আগে এসব ভূমিকার ওপর সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব স্পষ্ট ছিল। এখন সেই কর্তৃত্ব আড়ালে গেছে, আর সামরিক কাঠামো সামনে এসেছে।
ইরানি বিশ্লেষক আরাশ আজিজির মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হয়তো এখনো মোজতবা খামেনির কাছে যায়। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার অবস্থানে আছেন কি না, তা নিয়ে বড় সন্দেহ আছে। বিশেষ করে যারা যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নতুন নেতা কতটা যেতে পারবেন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মোজতবার ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, তিনি আইআরজিসির সমর্থন নিয়েই সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন। সংস্কারপন্থী বা তুলনামূলক নমনীয় প্রার্থীদের চেয়ে মোজতবাকে বাহিনীটি বেশি নিরাপদ পছন্দ হিসেবে দেখেছে। কারণ তাঁর মধ্যে তারা কঠোর নীতির ধারাবাহিকতা দেখতে পেয়েছে। কিন্তু এই সমর্থনের বিনিময়ে মোজতবার নিজের স্বাধীন ক্ষমতা কতটা অবশিষ্ট আছে, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ইরানের রাজনীতিতে কট্টরপন্থী নেতাদেরও সক্রিয়তা বেড়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত সাবেক আলোচক সাঈদ জালিলিসহ কয়েকজন নেতা যুদ্ধের সময় জোরালো বক্তব্য দিয়ে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবে বক্তব্য দেওয়া আর নীতি নির্ধারণ করা এক বিষয় নয়। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা সীমিত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গায় এখন সামরিক নিরাপত্তা কাঠামোই বেশি প্রভাবশালী।
এই পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। যদি সর্বোচ্চ নেতা কেবল অনুমোদনের প্রতীক হয়ে থাকেন এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত যায় সামরিক নেতৃত্বের হাতে, তাহলে ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। সেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভাষা থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্তের বাস্তব শক্তি থাকবে নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের হাতে।
এ ধরনের কাঠামো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও কঠোর করতে পারে। কারণ যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব সাধারণত আপসের চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিরোধী মত, সংস্কারপন্থী রাজনীতি বা কূটনৈতিক নমনীয়তার জায়গা সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আলোচনাও আরও কঠিন হতে পারে, কারণ সামরিক নেতৃত্ব সাধারণত প্রতিপক্ষের চাপের মুখে দ্রুত ছাড় দিতে অনিচ্ছুক থাকে।
তবে এই পরিবর্তনের আরেকটি দিকও আছে। একক নেতৃত্বের দুর্বলতা কখনো কখনো রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্তহীন করে তোলে। যদি প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে বিভিন্ন সামরিক ও নিরাপত্তা মহলের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হয়, তাহলে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ধীর হতে বাধ্য। পাকিস্তানি কর্মকর্তার ২ থেকে ৩ দিনের বিলম্বের মন্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনে।
সব মিলিয়ে, ইরানে এখন ক্ষমতার যে নতুন বিন্যাস দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একজন নেতার অনুপস্থিতি বা আড়ালে থাকার গল্প নয়। এটি একটি গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আলি খামেনির যুগে যে কেন্দ্রীভূত ধর্মীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রের সব বড় সিদ্ধান্তের শেষ আশ্রয় ছিল, মোজতবা খামেনির সময় সেই জায়গা অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। সামনে আছে যুদ্ধ, চাপ, আলোচনার অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন।
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—দেশটি কি আবার একজন সর্বোচ্চ নেতার হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করবে, নাকি আইআরজিসির নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন শাসনব্যবস্থাই নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে তেহরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার গতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরবর্তী অধ্যায়।
সিভি/এইচএম

