যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী—জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি—হত্যার ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ও পরিকল্পিত ধাপ অনুসরণ করা হয়েছিল। নিহত উভয়ের বয়স ২৭।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সর্বশেষ তাদের দেখা যায়। নিখোঁজের প্রায় ১০ দিন পরে লিমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে।
অভিযুক্ত ও অভিযোগ
এই হত্যাকাণ্ডে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ফ্লোরিডার আদালত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দেন। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ দুটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে হত্যার বিস্তারিত সময়রেখা উপস্থাপন করেছেন, যেখানে সন্দেহভাজন এবং ভুক্তভোগীদের গতিবিধি তুলে ধরা হয়েছে।
হত্যার সূচনা: নিখোঁজের দিনগুলো
১৬ এপ্রিল:
সর্বশেষ লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে তাদের বন্ধুদের যোগাযোগ হয়। দুপুরে বৃষ্টি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা ক্যাম্পাসে দেখা গেলেও সন্ধ্যায় নির্ধারিত সাক্ষাতে উপস্থিত হননি। লিমনের ফোন লোকেশন বাসা ও ক্যাম্পাস এলাকায় থাকলেও সন্ধ্যায় ক্লিয়ারওয়াটারে দেখা যায়। একই সময়ে সন্দেহভাজনের গাড়িও ওই এলাকায় ছিল।
রাত ১০টার দিকে হিশামের ফোন থেকে ডোরড্যাশের মাধ্যমে আবর্জনা, ক্লিনিং সামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিস অর্ডার করা হয়। রাত ১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তিনি একাধিকবার একটি সেতু এলাকায় যাতায়াত করতে দেখা যায়।
১৭ এপ্রিল:
নিখোঁজের খবর প্রকাশ পায়। হিশাম হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃষ্টির কাজের স্থান থেকে তার ব্যক্তিগত জিনিস উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ছিল খাবারের বাক্স, ম্যাকবুক ও আইপ্যাড।
২২-২৩ এপ্রিল:
তদন্তকারীরা হিশামের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। জানা যায়, হিশাম আগে রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভুগতেন এবং সহিংস আচরণ করতেন। ২৩ এপ্রিল নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর অবস্থা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ময়লা ফেলার স্থানে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট, বৃষ্টির মোবাইল কভার এবং লিমনের মানিব্যাগ ও রক্তমাখা পোশাক পাওয়া যায়।
লাশ উদ্ধার ও পরবর্তী অভিযান
২৪ এপ্রিল:
লিমনের লাশ হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে উদ্ধার করা হয়। অভিযুক্তের ফোনের তথ্য অনুযায়ী ১৭ এপ্রিল তিনি ওই স্থানে গিয়েছিলেন।
২৫ এপ্রিল:
আদালতে হিশামকে হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে মৃতদেহ সরানো, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটক রাখা এবং শারীরিক লাঞ্ছনা সম্পর্কিত অভিযোগও আনা হয়েছে।
২৬ এপ্রিল:
শেরিফ অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানবদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে এটি বৃষ্টির হতে পারে।
২৭-২৮ এপ্রিল:
ফ্লোরিডার অঙ্গরাজ্য আদালত হত্যাকাণ্ডকে গুরুত্বসহকারে তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করেছে। হিশামকে দুই হত্যা মামলায় জামিন ছাড়া কারাগারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি নিহতদের আত্মীয় বা সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না।
এই হত্যাকাণ্ডে যে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করা হয়েছে, তা একটি সাধারণ হত্যার চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও পূর্বপরিকল্পিত। সন্দেহভাজনের আচরণ, তার অনলাইন অনুসন্ধান এবং হত্যার পর পদক্ষেপগুলি একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা বিদেশে শিক্ষার সময় এমন ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া নিয়ে সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি।
তদন্ত এখনো চলছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে আরও তথ্য প্রকাশ করা হতে পারে। এই ঘটনাটি সামাজিক সচেতনতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
সিভি ডেস্ক/এইচএম

