মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এখন আর শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক কূটনীতি এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ পর্যন্ত। ইরান ও তার মিত্রদের ধারাবাহিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আট দেশে অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব হামলায় কয়েকটি ঘাঁটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি কিছু স্থাপনা প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা। যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরানের লক্ষ্যভিত্তিক হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি যত বিস্তৃতই হোক, তা পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে কয়েকটি মার্কিন স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতির চিত্র দেখা যায়। কোনো কোনো স্থাপনা আগুনে পুড়ে গেছে বলেও ফুটেজে দাবি করা হয়েছে। এই দৃশ্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিতও বহন করে।
কুয়েতের বুহরিং সামরিক ঘাঁটির সঙ্গে যুক্ত একজন প্রত্যক্ষদর্শী হামলার ধরনকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এত দ্রুত, এত নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে এবং এত উন্নত প্রযুক্তির হামলা আগে দেখা যায়নি। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হামলাগুলো কেবল প্রতিশোধমূলক ছিল না; বরং সেগুলোর পেছনে সুপরিকল্পিত সামরিক কৌশল কাজ করেছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতেও মার্কিন বিমানের ওপর হামলার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন করা কয়েকটি মার্কিন বিমান কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান শুধু আক্রমণের উপকরণ নয়; নজরদারি, প্রতিরক্ষা, দ্রুত মোতায়েন এবং আঞ্চলিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
এই হামলার আরেকটি বড় দিক হলো ইরানের লক্ষ্য নির্বাচন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল মার্কিন উন্নত রাডার ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিমান। এগুলোর অনেকই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন। অর্থাৎ ইরান এমন জায়গায় আঘাত করেছে, যেখানে ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়; দীর্ঘমেয়াদেও সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের এক সহকারীর মন্তব্যও এই বিশ্লেষণকে শক্তিশালী করে। তাঁর মতে, ইরান এমন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেছে, যেগুলো আঘাত করার জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন রাডার ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং সীমিত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ফলে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি এবং আগাম সতর্কীকরণ সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপও কম নয়। পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জুলস হার্স্ট তৃতীয় গত বুধবার আইনপ্রণেতাদের জানান, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয় সাধারণত শুধু অস্ত্র বা সেনা মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘাঁটি মেরামত, সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, রসদ সরবরাহ, জ্বালানি ব্যয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং কূটনৈতিক চাপ সামলানো—সব মিলিয়ে এই ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে।
কংগ্রেসের এক কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, শুধু মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদরদপ্তর মেরামতেই ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এই সংখ্যা দেখায়, হামলার ক্ষতি শুধু সামরিক নয়, আর্থিক দিক থেকেও বড় আঘাত। যুক্তরাষ্ট্র এখন এসব ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি মেরামত করবে, নাকি কিছু স্থাপনা বন্ধ করে দেবে—তা নিয়েও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে।
এক পক্ষ বলছে, কিছু স্থাপনা এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো চালু রাখার অর্থ নেই। অন্য পক্ষের যুক্তি, এসব ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত সুবিধা দেয়; তাই এগুলো মেরামত করা উচিত। এই বিতর্ক আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সামরিক নীতির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এত বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা কি এখনও কার্যকর, নাকি তা এখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে?
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দিন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সপরিবারে হত্যা করে। একই দিনে ইরানের মিনাব শহরের একটি মাধ্যমিক স্কুলে হামলায় দেড় শতাধিক শিশু নিহত হলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে গড়ায়। এই ঘটনার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া শুধু আবেগঘন ছিল না; তা সামরিকভাবে সংগঠিত এবং আঞ্চলিকভাবে বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
পরে ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়। সেই যুদ্ধবিরতি পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুত অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই বাস্তবতা দেখাচ্ছে, কূটনৈতিক ভাষায় শান্তির কথা বলা হলেও সামরিক প্রস্তুতি থেমে নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতার মেয়াদ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর যুদ্ধ ক্ষমতার দুই মাসের মেয়াদ আজ রোববার শেষ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে হলে তাঁকে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন পাওয়া তাঁর জন্য সহজ নাও হতে পারে। বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি নিজ দলের ভেতর থেকেও আপত্তি উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতা শেষ হয়েছে। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে তিনি হয়তো সরাসরি যুদ্ধের দায় বা কংগ্রেসীয় অনুমোদনের প্রয়োজন এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তবে বাস্তবে যদি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র মজুত, সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তাহলে এই ঘোষণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কূটনৈতিক অচলাবস্থাও কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত শুক্রবার পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবেও সন্তুষ্ট নন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি থাকলেও রাজনৈতিক দূরত্ব এখনও গভীর।
ইরানের সামরিক বাহিনীও সতর্ক বার্তা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না থাকে, তাহলে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, তারা এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে ইরান পাকিস্তানের কাছে তার পরিকল্পনা দিয়েছে। এখন কূটনীতির পথ বেছে নেওয়া বা সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
এই বক্তব্যে ইরান নিজেকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে দেখাতে চাইছে। তেহরানের ভাষ্য হলো, তারা জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে বাস্তবতা হলো, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে নিরাপত্তার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করছে। ফলে সমঝোতার জায়গা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য ইরানকে টোল বা অন্য কোনো ফি দিলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এই সতর্কতা সরাসরি জ্বালানি বাণিজ্য ও সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে সেখানে উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিও চাপে পড়ে।
ওয়াশিংটন ইরানের তেল বাণিজ্যে যুক্ত চীনা সংস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বেইজিং এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়েছে। চীনের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের ওপর নিজের আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর জবাবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে একটি নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল কেনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ৫টি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সিনহুয়ার তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানগুলো হলো হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল দালিয়ান রিফাইনারি, শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংজিং কেমিক্যাল। এই নিষেধাজ্ঞা দেখায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু বড় অর্থনীতির ওপর পড়ে না; বিমান চলাচল, পণ্য পরিবহন, খাদ্যদ্রব্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স তাদের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এটি দেখায়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরের বেসামরিক খাতও এই সংঘাতের অভিঘাত এড়াতে পারছে না।
এদিকে লেবাননেও সংঘাত থামেনি। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ৭০০তে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আট হাজার ১৮৩ জন। গতকাল ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী লেবাননের আরও ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাদের হামলায় সাতজন নিহত হন। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, উপকূলীয় গ্রাম বিয়াদায় তারা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের পরিস্থিতি প্রমাণ করে, এই যুদ্ধ একক কোনো সীমান্তে আটকে নেই। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী, সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই তা নতুন ফ্রন্ট খুলে দেয়। লেবানন তার বড় উদাহরণ।
ইসরায়েলের ভেতরেও নতুন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা হচ্ছে দাবি করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন মাগা নেত্রী মার্জোরি টেইলর গ্রিন। একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী মার্কিন খ্রিষ্টানদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারো জেরুজালেমে একজন ফরাসি সন্ন্যাসিনীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন বহুমাত্রিক। একদিকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতা সামনে এনেছে। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির পরও কূটনৈতিক সমাধান অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করছে। লেবাননে প্রাণহানি বাড়ছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা পাল্টা-নিষেধাজ্ঞায় সংঘাতের অর্থনৈতিক মাত্রা আরও জটিল হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়। এটি রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি পথ, নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতি, জনমত, ধর্মীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সমন্বিত সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তার প্রতিটি ঢেউ বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধবিরতি আপাতত বড় সংঘর্ষ ঠেকিয়ে রাখলেও অচলাবস্থা কাটেনি। ইরান বলছে, তারা আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, প্রস্তাবে তারা সন্তুষ্ট নয়। আর এর মাঝেই ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি, বাড়তে থাকা যুদ্ধব্যয়, অস্থির তেলের বাজার এবং লেবাননের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য এখনও এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সিভি/এইচএম

