ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তার কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তার যুক্তি, অতীতেও অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতেও তিনি একই পথ অনুসরণ করতে পারেন।
শুক্রবার যুদ্ধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ৬০ দিনের সময়সীমা সামনে আসার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করতে পারে—এ ধারণাকে তার অনেক পূর্বসূরি অসাংবিধানিক মনে করতেন। তার ভাষায়, আগের বহু প্রেসিডেন্টই এই সীমা অতিক্রম করেছেন এবং বাস্তবে এই নিয়ম কখনো কঠোরভাবে কার্যকর হয়নি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেনি; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার রেজ্যুলেশন অনুযায়ী, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ালে তাকে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হয়। এরপর ৬০ দিনের মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হয়, যদি কংগ্রেস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন না দেয়।
এই আইনটি মূলত ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা চেয়েছিলেন, যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্ত এককভাবে হোয়াইট হাউসের হাতে না থাকুক।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসকে জানানো হয়েছিল। সেই হিসাবে শুক্রবার ছিল ৬০তম দিন। আইনগতভাবে এই সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর পর সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ভিন্ন। ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় ৬০ দিনের সময়সীমার গণনা স্থগিত হয়েছে। তাদের মতে, যখন সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ চলছে না, তখন এই সময়সীমা আগের মতো প্রযোজ্য নয়।
কিন্তু এখানেই বিতর্ক। সমালোচকেরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি মানেই যুদ্ধ শেষ নয়। সেনা মোতায়েন, সামরিক প্রস্তুতি, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা এবং ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থা এখনও চলমান থাকলে এটিকে সম্পূর্ণ শান্ত অবস্থা বলা যায় না।
ট্রাম্প তার অবস্থান শক্ত করতে আগের প্রেসিডেন্টদের উদাহরণ সামনে আনছেন। সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন অনেক নজির আছে, যেখানে প্রেসিডেন্টরা সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই এগিয়েছেন।
তবে সব প্রেসিডেন্ট একই পথ নেননি। ১৯৮৩ সালে রোনাল্ড রিগ্যান লেবাননে মার্কিন মেরিন মোতায়েনের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ কংগ্রেসের সমর্থন চান। জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেন।
অন্যদিকে, বিল ক্লিনটন ১৯৯৯ সালে কসোভোতে ৭৮ দিনের বোমা হামলা চালান কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই। বারাক ওবামা ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক অভিযান ৬০ দিনের সীমা পেরিয়েও চালিয়ে যান। তখন ওবামা প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, সেই অভিযান সরাসরি “শত্রুতাপূর্ণ যুদ্ধ” নয়।
এই নজিরগুলোই এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঢাল। তিনি বোঝাতে চাইছেন, আগের প্রেসিডেন্টরা যখন এমন করেছেন, তখন তার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, অতীতের বিতর্কিত নজির কোনো আইনগত বৈধতার নিশ্চয়তা দেয় না। আগের প্রেসিডেন্টরা আইন পাশ কাটিয়ে থাকলে সেটি বর্তমান প্রেসিডেন্টের জন্য স্বয়ংক্রিয় অনুমতি হয়ে যায় না।
মিনেসোটার হ্যামলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভ শুল্টজ মনে করেন, আগের প্রেসিডেন্টরা কোনো আইন পুরোপুরি মানেননি বলেই সেটি সঠিক হয়ে যায় না। তার মতে, ট্রাম্প কার্যত কংগ্রেসের স্পষ্ট সমর্থন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান সংঘাতে যুক্ত করেছেন।
শুল্টজের বক্তব্যে একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই আইনপ্রণেতারা চেয়েছিলেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট একক ক্ষমতা না পান। কারণ যুদ্ধ শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, জনজীবন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই কারণে কংগ্রেসকে যুদ্ধঘোষণার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টরা সামরিক সিদ্ধান্তে ক্রমশ বেশি স্বাধীনতা দাবি করতে শুরু করেন। ইরান সংঘাত সেই পুরোনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় পরিস্থিতি বদলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধবিরতি কি যুদ্ধের সমাপ্তি, নাকি কেবল সাময়িক বিরতি?
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অচলাবস্থা এখনও কাটেনি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে আপাত নীরবতা থাকলেও রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান নয়, বিশ্ববাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তেলের দাম, বাণিজ্যপথ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভারসাম্য—সবকিছুই এই সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ভিয়েতনাম যুদ্ধের ১৯ বছর, ইরাক যুদ্ধের প্রায় ৯ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৬ বছর কিংবা কোরিয়া যুদ্ধের ৩ বছরের তুলনায় অনেক ছোট। তার বক্তব্যের মূল অর্থ হলো, এই সংঘাতকে দীর্ঘ যুদ্ধ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।
কিন্তু ইতিহাস দেখায়, যুদ্ধের মেয়াদ শুরুতে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। অনেক সংঘাত শুরু হয় সীমিত অভিযানের নামে, পরে তা দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। ইরাক ও আফগানিস্তান তার বড় উদাহরণ।
ইরান সংঘাতও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব, হরমুজ প্রণালি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে এটি শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকট।
যুদ্ধের সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ হলো গণতান্ত্রিক জবাবদিহি। প্রেসিডেন্ট দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দায় বহন করে পুরো দেশ। সৈন্য, অর্থনীতি, করদাতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছু এতে জড়িত।
যদি প্রেসিডেন্ট এককভাবে যুদ্ধ শুরু ও চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে কংগ্রেসের যুদ্ধসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। আবার অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের সমর্থকেরা বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নির্বাহী শাখার হাতে নমনীয়তা থাকা দরকার।
এই দুই অবস্থানের সংঘাতই এখন ট্রাম্পের ইরান নীতিকে ঘিরে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কত দূর এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করতে পারে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু যদি নতুন করে হামলা, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ বা হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হবে।
এখন মূল প্রশ্ন তিনটি।
প্রথমত, যুদ্ধবিরতির সময় ৬০ দিনের সীমার মধ্যে গণনা হবে কি না।
দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস কি প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা কার্যকরভাবে সীমিত করতে পারবে?
তৃতীয়ত, ইরান সংঘাত কি সত্যিই ছোট থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হবে?
২০১৪ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে বারাক ওবামা বলেছিলেন, যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে শেষ করা অনেক কঠিন। ইরান পরিস্থিতি সেই কথাটিকেই নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।
ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, তিনি অতীতের প্রেসিডেন্টদের পথেই হাঁটছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—সংবিধান, কংগ্রেস এবং যুদ্ধের বাস্তব মূল্য কি সেই যুক্তিকে সহজে মেনে নেবে?
সিভি/এইচএম

