ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে আজ সোমবার, যা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণ। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে ভোট গণনা, আর দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করবে কে বসছেন রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রে।
তবে এবারের ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে একটি আসন বাদ দিয়ে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল হওয়ায় সেখানে গণনা হচ্ছে না। ফলে মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনের ফল আজ প্রকাশিত হবে। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং এরপর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ভোট গণনা চলছে।
এবারের নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন দল, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র তৃণমূল কংগ্রেস—দুই শিবিরই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে এত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কমই দেখা গেছে।
দুই দফার ভোটে রেকর্ড ৯৩ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতি এই নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত ভোট গণনায় চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে, ফলে দুপুর ১২টার পর থেকেই ফলাফলের চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
বুথফেরত সমীক্ষাগুলোর বড় একটি অংশ ইঙ্গিত দিচ্ছে সম্ভাব্য ক্ষমতার পালাবদলের দিকে। অনেক জরিপে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে—কোনো দলই এককভাবে ১৪৮ আসনের জাদুকরী সংখ্যা স্পর্শ করতে নাও পারে। সেক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গণনাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নজিরবিহীন। প্রতিটি গণনাকেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। সিসিটিভি ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কেবলমাত্র কিউআর কোডযুক্ত পরিচয়পত্রধারীরাই প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন, আর মোবাইল ফোন বহনে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
রাজ্যের ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে ভোট গণনা চলছে, যার মধ্যে কলকাতায় রয়েছে পাঁচটি কেন্দ্র। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র, যেখানে একাধিক আসনের ভোট গণনা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে মোট ৪৩২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। পাশাপাশি ১৬৫ জন অতিরিক্ত গণনা পর্যবেক্ষক এবং ৭৭ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। উত্তর ২৪ পরগনায় সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যবেক্ষক মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে অভিযোগ-প্রত্যাঘাতে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইভিএমে কারচুপি হতে পারে। তাই দলীয় নেতাকর্মীদের স্ট্রং রুম পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজেও কয়েক ঘণ্টা স্ট্রং রুমে অবস্থান করেছেন, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
অন্যদিকে বিজেপিও গণনা প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজর রাখছে। অল্প ব্যবধানে ফল হলে পুনর্গণনার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ, শুধু ভোট নয়—গণনাকেও ঘিরে চলছে সমান উত্তেজনা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগে ভোট বাতিল করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রের ২৮৫টি বুথে আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে, আজকের দিনটি শুধু একটি নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন নয়—এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিন। মোদি না দিদি—শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে মসনদ, তার উত্তর মিলবে আজই।
সিভি/এইচএম

