কেরালার ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এক অনন্য রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে শেষ হয়েছে। এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা নিঃসন্দেহে ৩৪ বছর বয়সী আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়ার জয়। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পেরাম্ব্রা আসনে জয়ী হয়ে তিনি শুধু একটি আসন জেতেননি, বরং ইতিহাসও তৈরি করেছেন। ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগের প্রথম নারী হিসেবে রাজ্য আইনসভায় প্রবেশ করে তিনি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন।
এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। সেখানে সিপিআই (এম)-এর অভিজ্ঞ নেতা ও এলডিএফের কনভেনর টি.পি. রামকৃষ্ণনকে হারানো সহজ কোনো বিষয় ছিল না। অথচ ফাতিমা তাহিলিয়া ৮১ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে ৫ হাজার ৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। এই ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং কেরালার ভোটারদের মানসিকতায় পরিবর্তনেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও এই আসনে রামকৃষ্ণন বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। তাই এবারের ফলাফলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে মালাবার অঞ্চলে ভোটারদের এই পরিবর্তিত মনোভাব ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফাতিমা তাহিলিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্ররাজনীতি থেকে। মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের মাধ্যমে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে সংগঠনটির নারী শাখা ‘হারিতা’র প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই তরুণী ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
তার প্রচারণার ধরনও ছিল ভিন্নধর্মী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তিনি তরুণ ও প্রবীণ উভয় শ্রেণির ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা, বিশেষ করে জীবিকা ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। এর ফলে ভোটারদের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
আইন পেশায় যুক্ত থাকা ফাতিমা তাহিলিয়া কোঝিকোড জেলা আদালতে কাজ করছেন। ত্রিশূরের সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন। এর আগে ২০২০ সালে কোঝিকোড সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতেও নিজের উপস্থিতি জানান দেন।
তবে তার পথচলা একেবারেই মসৃণ ছিল না। অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি নারী অধিকার নিয়ে অবস্থান নেওয়ার কারণে সংগঠনের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে হয় তাকে। একপর্যায়ে তিনি সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেও বহিষ্কৃত হন। কিন্তু এসব বাধা তাকে থামাতে পারেনি। বরং নিজের অবস্থানে দৃঢ় থেকে তিনি এগিয়ে গেছেন।
ফাতিমা তাহিলিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানও আলাদা করে নজর কাড়ে। তিনি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং নারীর অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে মুসলিম নারীদের শিক্ষা ও পরিচয়ের বিষয়েও তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তার এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
এই জয়কে শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত কেরালার রাজনীতিতে নারী অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এতদিন যে দল নারী প্রার্থী খুব কম দিত, সেই দল থেকেই একজন তরুণী উঠে এসে ইতিহাস গড়লেন—এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় বার্তা।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে ভোটাররা এখন শুধুমাত্র প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণে আটকে নেই। তারা নতুন মুখ, নতুন চিন্তা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম নেতৃত্ব খুঁজছে। সেই জায়গায় ফাতিমা তাহিলিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
কেরালার এই নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনীতির চরিত্র পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এক তরুণী—ফাতিমা তাহিলিয়া।
সিভি/এইচএম

