গাজায় দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযান, বেসামরিক হতাহতের ভয়াবহ চিত্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা সমালোচনার মুখে এবার নতুন এক লড়াইয়ে নেমেছে ইসরায়েল। তবে সেটি যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং বিশ্বজনমতের ময়দানে। নিজেদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে ২০২৬ সালের জন্য জনকূটনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রচারণা কার্যক্রমে প্রায় ৭৩০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭৩ কোটি ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
এই বিপুল বাজেট শুধু একটি সরকারি ব্যয় নয়, বরং এটি ইসরায়েলের বর্তমান কূটনৈতিক সংকটের গভীরতাও সামনে এনে দিয়েছে। কারণ মাত্র কয়েক বছর আগেও একই খাতে তাদের বরাদ্দ ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগে এ ধরনের প্রচারণামূলক কার্যক্রমে বছরে খরচ করা হতো প্রায় ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলারের মতো। আর গত বছর এই বাজেট ছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বরাদ্দ কয়েক গুণ বেড়ে এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কাকতালীয় নয়। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের প্রতিবাদ ইসরায়েলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যুদ্ধের ভয়াবহ ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আগের মতো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল যে কৌশলটি সামনে আনছে, সেটি দেশটির ভাষায় ‘হাসবারা’। মূলত এটি এমন এক জনকূটনৈতিক প্রচারণা, যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, সমালোচনার জবাব দেওয়া এবং বিশ্বজনমতকে নিজেদের পক্ষে নেওয়া। দীর্ঘদিন ধরেই এই কৌশল ব্যবহার করে আসছে তেল আবিব, তবে এবার সেটিকে অনেক বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, পশ্চিমা বিশ্বের জনমতেও বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অথচ বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী মিত্র।
বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মার্কিন নাগরিক ফিলিস্তিনিদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, নাগরিক আন্দোলন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোতেও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ফলে তেল আবিব বুঝতে পারছে, সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা গেলেও জনমতের যুদ্ধ হারলে দীর্ঘমেয়াদে তার কূটনৈতিক মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
এ কারণেই ইসরায়েল এখন শুধু অস্ত্র বা সামরিক জোটের ওপর নির্ভর করছে না, বরং তথ্য, প্রচার এবং জনমতকে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, বিদেশি সাংবাদিক ও প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত করা এবং বিভিন্ন দেশে জনসংযোগ কার্যক্রম জোরদারের কাজে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, শুধু প্রচারণা চালিয়ে বাস্তবতার চিত্র বদলানো সম্ভব নয়। গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহর এবং মানবিক সংকটের যে চিত্র বিশ্ব দেখেছে, তা সহজে ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তাদের মতে, ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেয়ে রাজনৈতিক সমাধান ও মানবাধিকার প্রশ্নে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বেশি জরুরি।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের এই নতুন বাজেট শুধু একটি প্রচারণা কর্মসূচি নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে ক্রমশ বাড়তে থাকা চাপ এবং সমর্থন হারানোর আশঙ্কারও স্পষ্ট প্রতিফলন।
সিভি/এইচএম

