পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ সালের ‘পরিবর্তন’-এর রাজনীতিতে, বিশেষ করে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তার নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর শুভেন্দু রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার কৌশল ও সক্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরির পেছনে ছিল সংগঠনগত দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অসন্তোষ। বিশেষ করে দলীয় কাঠামোয় নতুন প্রজন্মের উত্থান এই দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।

২০১১ সালে বাংলায় পরিবর্তনের ভিত তৈরি হয়েছিল নন্দীগ্রামে। সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শুভেন্দুই। তিনিই ছিলেন স্থপতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতই তাকে সেই কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করুন না কেন, নন্দীগ্রামের মানুষ তা ভোলেননি। পনেরো বছর পর বাংলায় পরিবর্তন হলো। ফের পালাবদল। সেই পালাবদলের সেনাপতি হিসেবেও ইতিহাস গড়লেন শুভেন্দু অধিকারী। এই লড়াই, এই রাজনৈতিক জেদ সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও বিরল।
শুভেন্দু যে এবার ভবানীপুর বিধানসভা আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে পারেন, তা গণমাধ্যমে আগেই প্রকাশ পায়। দলের প্রার্থী বাছাইয়ের সময় অমিত শাহ তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ভবানীপুরে প্রার্থী করার জন্য কার নাম ভেবেছেন? শুভেন্দু জবাবে বলেছিলেন, আপনারা অনুমতি দিলে আমিই প্রার্থী হতে পারি। কথা দিচ্ছি, হারিয়েই ছাড়ব।
একা অমিত শাহ বা নিতিন নবীনের পক্ষে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুমতিও নিয়েছিলেন তারা। তারপর গত দেড় মাসে যেভাবে পরিস্থিতি বদলে গেল, যেভাবে মাপা পদক্ষেপে শুভেন্দু সেখানে প্রচার করলেন, যেভাবে মহা সমারোহে ভবানীপুরের মানুষ বিপুল ব্যবধানে শুভেন্দুকে জিতিয়ে দিলেন।

তবে এই মহাকাব্যের রচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১১ সালের কিছু পর থেকেই। শুভেন্দু তখন তৃণমূলের যুব সভাপতি। আর প্রবীণ মুকুল রায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। মুকুল রায়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বুদ্ধি দিয়েছিলেন যে তৃণমূল যুবা নামে একটি সংগঠন তৈরি করে তার দায়িত্ব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে দেওয়া হোক। সেটাই ছিল প্রথম পদক্ষেপ।
তার কিছুদিন পর শুভেন্দুকে দলের যুব সভাপতি পদ থেকেও সরিয়ে দেন মমতা ও মুকুল। সেদিনই দেয়ালের লিখন পড়ে ফেলেছিলেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে তার লড়াই, লালগড়-জঙ্গলমহলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সংগঠন তৈরির কোনো মূল্যই দেবে না এই দল। পরিবারতান্ত্রিক পার্টিতে রক্তের সম্পর্কই অগ্রাধিকার পাবে।

