ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এখন শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। যুদ্ধ, অবরোধ, হরমুজ প্রণালী, তেলের সরবরাহ, দাম, মুনাফা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ শুধু একটি অঞ্চলের নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
২০২৬ সালের ৬ মে প্রকাশিত জেমস কে গ্যালব্রেইথের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থানকে শুধু নিরাপত্তা বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। এর পেছনে তেলের দাম, উৎপাদন খরচ, জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। লেখকের মতে, “তিন দিনের যুদ্ধ” ঘোষণার পরও নয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে উত্তেজনা চলতে থাকা প্রমাণ করে যে সংকটটি ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক। বিশেষ করে পশ্চিম টেক্সাস ও দক্ষিণ-পূর্ব নিউ মেক্সিকোর পার্মিয়ান অববাহিকায় শেল তেল উৎপাদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে গেছে। কিন্তু এই উৎপাদনের একটি বড় সমস্যা হলো খরচ। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পার্মিয়ান অঞ্চলের তেল উৎপাদনের আনুমানিক লাভ-লোকসান সমতা মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার। অথচ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেলের বাজারমূল্য এই স্তরের নিচে বা আশপাশে ছিল। ফলে ২০২৩ সালের পর পার্মিয়ান অঞ্চলে সক্রিয় কূপের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়, যদিও উন্নত দক্ষতার কারণে ২০২৫ সালে উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
এখানেই তেলের বাজারের রাজনৈতিক অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের আগে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল খাতে বিনিয়োগ করা বেসরকারি পুঁজি, বিশেষ করে ২০২০–২১ সালে সস্তা দামে তেলসম্পদে বিনিয়োগকারীরা, বড় চাপের মধ্যে ছিল। তাদের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলারের নিচে বা কাছাকাছি দাম দীর্ঘমেয়াদে খুব লাভজনক নয়। তাই তেলের দাম কিছুটা বাড়লে তারা সরাসরি লাভবান হয়।
ইরান সংকটের প্রথম মাসে দক্ষিণ উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় অংশের তেল সরবরাহ কার্যত বাজারের বাইরে চলে যায়। এতে বৈশ্বিক তেল প্রবাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। এই সরবরাহ সংকোচনের প্রভাব দ্রুত বাজারে দেখা যায়। পশ্চিম টেক্সাসের মানদণ্ডভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে পৌঁছে যায়—অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি। এই দামবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদকদের জন্য প্রথমদিকে লাভজনক মনে হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, তেলের দাম বেশি বাড়লে সেটি আবার অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে তেলের দাম উঠলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে শুরু করে। পরিবহন, কৃষি, শিল্প, খাদ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপে শুধু তেল নয়, সালফার, ইউরিয়া ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে। আর দাম যদি আরও বেশি বাড়ে, তাহলে চাহিদা কমে যায়। অর্থাৎ দাম খুব বেশি হলে উৎপাদকরাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ বাজার ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি হতে পারে এমন একটি বাজার, যেখানে উপসাগর পুরোপুরি বন্ধ নয়, আবার সরবরাহও কিছুটা কম থাকে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে দাম তুলনামূলক সুবিধাজনক। এই দামে শেল তেল উৎপাদকরা লাভ করতে পারে, আবার বাজার পুরোপুরি ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো—যদি এই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ইরানের হাতে থাকে, তাহলে একই পরিস্থিতি ইরানের জন্যও লাভজনক হয়ে ওঠে।
ইরান মার্চ মাসে উৎপাদন বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ উপসাগরীয় অঞ্চলের বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত সরবরাহের সুযোগ নিয়ে ইরান বাজারের অংশ বাড়াতে পারে। ফলে এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়: দুই দেশ রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে মুখোমুখি হলেও তেলের দামের নির্দিষ্ট একটি স্তরে উভয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থ আংশিকভাবে মিলে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা হলো—এই পরিস্থিতিতে লাভবান হচ্ছে ইরান।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের পথ নেয়। কিন্তু অবরোধ কার্যকর করতে পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকলে সব ইরানি তেলবাহী জাহাজ আটকানো সম্ভব নয়। ফলে এটি পুরোপুরি সামরিক চাপ নয়, বরং দর-কষাকষির একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে তেলের দামকে এমন এক সীমায় ধরে রাখা, যা যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের জন্য লাভজনক, কিন্তু বিশ্ববাজারকে পুরোপুরি অস্থিতিশীল করে না। তবে এমন সমঝোতা হলে উপসাগরীয় যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ আরব রাজতন্ত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ইসরায়েলের জন্যও তা কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখা দিতে পারে।
এখানে হরমুজ প্রণালী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। যদি পারস্য উপসাগর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্লেষকের হিসাব অনুযায়ী পশ্চিম টেক্সাসের মানদণ্ডভিত্তিক তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এমন দাম বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে। পরিবহন ব্যয়, খাদ্যদাম, শিল্প উৎপাদন, আমদানি ব্যয়—সবকিছুতে ধাক্কা লাগবে। আবার এত বেশি দাম চাহিদা কমিয়ে বাজারকে উল্টো নিচে নামিয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া কারও জন্যই নিরাপদ নয়।
এই পরিস্থিতিকে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অপেক্ষার খেলা বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র চাইতে পারে মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘায়িত করতে, যাতে ইরানের তেল সংরক্ষণাগার ভরে যায় এবং একসময় ইরান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। কিন্তু সামরিক মোতায়েন অনন্তকাল ধরে রাখা যায় না। যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী রণতরী, নৌ-অবরোধ—সবকিছুর খরচ আছে, ঝুঁকি আছে, রাজনৈতিক চাপ আছে। দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনা ধরে রাখলে দুর্ঘটনা বা ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়ে।
ইরানের জন্য সময় একটি বড় সম্পদ হতে পারে। যদি তারা চাপ সহ্য করতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তিনটি পথ থাকে। প্রথমত, সংঘাত বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কায় ফেলা। দ্বিতীয়ত, পিছু হটে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অপমান মেনে নেওয়া। তৃতীয়ত, সময়ক্ষেপণ করে এমন একটি সমঝোতার চেষ্টা করা, যা বাইরে থেকে কূটনৈতিক সাফল্য বলে দেখানো যায়, কিন্তু বাস্তবে তেলের বাজারকে একটি সুবিধাজনক দামে স্থির রাখে।
তবে এই হিসাবের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো ইরানের প্রতিক্রিয়া। ইরান যদি হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা কম দামের বাজারেও লাভ করতে পারে—যেমন পথ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহের সময় নির্বাচন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত জ্বালানি স্বাধীনতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। ইউরোপও, যারা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভর করেছে, আবার রাশিয়া ও পারস্য উপসাগরের দিকে তাকাতে বাধ্য হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান সংকট দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধজাহাজের বিষয় নয়; এটি বাজার, দাম, বিনিয়োগ, উৎপাদন খরচ ও জ্বালানি সরবরাহের হিসাবের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তেলের দাম বাড়লে কেউ লাভবান হয়, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দাম খুব কম হলে উৎপাদক চাপে পড়ে, আর দাম খুব বেশি হলে ভোক্তা ও পুরো অর্থনীতি সংকটে পড়ে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল, ইউরোপ ও এশিয়া—সব পক্ষই একই বাজারে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হতে পারে উত্তেজনার ওঠানামা, হুমকি, সময়ক্ষেপণ এবং কোনো ধরনের অসম্পূর্ণ সমঝোতা। কিন্তু সেই পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ হরমুজ প্রণালীতে একটি ভুল পদক্ষেপ, একটি হামলা, একটি ভুল সংকেত বা একটি অতিরিক্ত কঠোর অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন জ্বালানি সংকটে ঠেলে দিতে পারে। আর যদি ইরান দীর্ঘ সময় টিকে যায়, তাহলে তেলের দাম আবার কমতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের পার্মিয়ান অঞ্চলের উচ্চ ব্যয়ভিত্তিক বিনিয়োগকারীরা বিপদে পড়তে পারে, এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির ভারসাম্য নতুনভাবে বদলে যেতে পারে।
এই সংকটের মূল শিক্ষা হলো, জ্বালানি বাজারকে শুধু বাজারের নিয়মে বোঝা যায় না। এর সঙ্গে যুদ্ধ, কূটনীতি, সামরিক উপস্থিতি, বেসরকারি পুঁজি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং জাতীয় নীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দীর্ঘমেয়াদে আরেক পথ নিতে পারে—শুধু জল্পনামূলক মুনাফার ওপর নির্ভর না করে জনগণের স্বার্থে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি নীতি গড়ে তোলা। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা আর বাস্তবে তা ঘটার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যবধানই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

