ইরানি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় উত্তরাঞ্চলে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ রকেট-ট্র্যাকিং ও সতর্কতা ব্যবস্থা সীমিত করে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এই সিদ্ধান্তে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ড সম্প্রতি এমন একটি নিরাপত্তা অ্যালার্ম সিস্টেমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জরুরি সেবাকর্মীদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার স্থান সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দিত।
যদিও তিন সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতি চলছে, তবুও ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে হিজবুল্লাহ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আশঙ্কা, ইরানি গোয়েন্দারা এই ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে ভবিষ্যৎ হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এ কারণেই ব্যবস্থা সীমিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার স্থানসংক্রান্ত তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের আওতায় রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের পর এই বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে হামলার সঠিক স্থান প্রকাশ না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে স্থানীয় প্রশাসনগুলো এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দল পাঠাতে পারত। তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তারা কার্যত অন্ধকারে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আপার গ্যালিলি আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান আসাফ ল্যাঙ্গেলবেন বলেন, “হিজবুল্লাহ কোথায় হামলা চালাচ্ছে, সেটা তারা জানে। অন্তত আমাদেরও জানা উচিত কোথায় আঘাত হেনেছে, যাতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো যায়।”
উত্তরাঞ্চলীয় শহর কিরিয়াত শমোনার মেয়র আভিচাই স্টার্ন বলেন, এই ব্যবস্থা বহুবার প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি ছাড়া আমাদের রেখে দেওয়ার অর্থ হলো এমন একটি অঞ্চলে আরও বেশি মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া, যেখানে অনেক বাসিন্দারই নিরাপদ আশ্রয় নেই।”
একজন স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সতর্ক সংকেতের সময় তারা “অন্ধ ইঁদুরের মতো” কাজ করেছেন। তার ভাষায়, “আমরা জানিই না কোথায় ছুটে যেতে হবে। হিজবুল্লাহ আবারও বাড়িঘর লক্ষ্যবস্তু করবে আর এর মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।”
আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো ব্যাখ্যা বা আলোচনা ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। তিনি বলেন, “তথ্য ফাঁস ঠেকানোর উপায় খোঁজার বদলে সবচেয়ে সহজ পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।”
তবে সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র ওয়াইনেটকে বলেন, এই ব্যবস্থায় সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে এবং যুদ্ধকালীন সময়ে এমন কিছু ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার কারণে তথ্য সুরক্ষা জোরদার করতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলে ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ বেড়েছে। মা’আরিভ পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ জন ইসরায়েলি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ৪০টির বেশি মামলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা অর্থের বিনিময়ে ইসরায়েলিদের নিয়োগ দিয়ে কৌশলগত স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করছে এবং হামলার পরিকল্পনায় সহায়তা নিচ্ছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ দাবি করেছে, ইরান দেশটির প্রভাবশালী নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (আইএনএসএস)-এর গবেষকদের গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় বছরে প্রতিষ্ঠানটির গবেষক ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকের বিবরণও ইরানের হাতে পৌঁছেছে।

