মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের জবাবে তারা অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান মূলত ড্রোন হামলা এবং বিমান অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, সেনা ব্যারাক, জ্বালানি ডিপো, সামরিক বিমান এবং রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা। একই সঙ্গে বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামেও আঘাতের দাবি করা হয়েছে।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এর আগে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করেনি।
সংঘাতের মধ্যে আরেকটি আলোচিত ঘটনা হলো একটি মার্কিন কেসি-১৩৫ স্টার্টোট্যাঙ্কার বিমানের নিখোঁজ হওয়ার খবর। প্রায় ৪০ থেকে ৫২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই সামরিক বিমানটি হরমুজ প্রণালির আকাশসীমা অতিক্রমের সময় রাডার থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে পরিচিত।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ তথ্যের ভিত্তিতেই এই খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সিএনএন–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৬টি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবি অস্বীকার করে আসছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যমের বরাতে আরও বলা হয়েছে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩৯টি সামরিক বিমান হারিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিমান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ধারাবাহিক হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এমনকি কিছু ঘাঁটিকে এখন স্বাভাবিক সেনা মোতায়েনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের একটি অংশ নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন সামরিক মুখপাত্রের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন এবং অনেক সময় ভুল ধারণাও তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরোপুরি শেষ হলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
এরই মধ্যে মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পুনরায় সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। পেন্টাগন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি প্রতিরক্ষা বাজেট চেয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতিতে আরও বড় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

