মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে আবারও শক্ত অবস্থানের বার্তা দিল ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও শোষণের নীতির কোনো স্থান থাকবে না। তার মতে, বিশ্ব এখন এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে আধিপত্য বিস্তার ও চাপ প্রয়োগের পুরোনো রাজনীতি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানি প্রেসিডেন্ট এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তেহরান এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চায় যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেবে না।
পেজেশকিয়ান তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে “সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা” এবং “শোষণের রাজনীতি”র বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যদিও তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি ইঙ্গিত করেই দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, সহনশীলতা এবং প্রতিরোধ—এই দুই বৈশিষ্ট্য ইরানের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। তার ভাষায়, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ইরানি জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। সেই পথ ধরেই দেশটি নিজেদের জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবে।
তার এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমানোর আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। তবে সেই আলোচনার মাঝেও তেহরান যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসছে না, পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগজিও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়, তখনই ওয়াশিংটন সামরিক চাপ ও আগ্রাসী পদক্ষেপের পথ বেছে নেয়।
আরাগজি প্রশ্ন তোলেন, এটি কি সত্যিই কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবের অংশ? তার মতে, বারবার সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের “প্রতিরোধী শক্তি” হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে পশ্চিমা চাপের মধ্যেও দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, হরমুজ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে ইরান এখন নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সাধারণ মানুষ এখনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা পেজেশকিয়ান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য শুধু আদর্শিক বার্তা নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধেও একটি রাজনৈতিক অবস্থান। তেহরান বোঝাতে চাইছে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে।

