মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার ইরানের অস্ত্র ও শাহেদ ড্রোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজে জড়িত ছিল। বিশেষ করে শাহেদ ড্রোন কর্মসূচিকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা রাজনীতিতেও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানি ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটেই এবার সরাসরি সরবরাহ নেটওয়ার্কে আঘাত হানার কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহকারী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এর মধ্যে অন্যতম হলো চীনভিত্তিক ইউশিতা সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের ‘সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি কো-অপারেশন’-এর হয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। এই সংস্থাকে ইরানের প্রযুক্তি ও অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী হিসেবে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই নেটওয়ার্ক চীন থেকে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে দুবাইভিত্তিক একটি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানও। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রমে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে সহায়তা করেছে। কয়েক মিলিয়ন ডলার হংকংভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এছাড়া হংকংভিত্তিক এইচকে হেসিন ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি এবং বেলারুশভিত্তিক আর্মরি অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞায় বেলারুশের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বেলারুশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রমে ভূমিকা পালন করে আসছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানি নাগরিক মোহাম্মদ মাহদি মালেকি এবং আর্মরি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী তোলিবভ। ওয়াশিংটনের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক অস্ত্র সংগ্রহ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বেলারুশ, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে, এই অভিযোগগুলো সেই বাস্তবতাকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরানের শাহেদ ড্রোন এখন শুধু একটি সামরিক প্রযুক্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিষেধাজ্ঞা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অভিযোগ, ইরান বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ড্রোন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং সেটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের সামরিক কর্মসূচি আত্মরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, তারা এখন শুধু ইরানের ভেতরের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত তৃতীয় দেশের ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক চাপ তৈরির জন্য নয়, বরং ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেওয়ার কৌশলও। বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প নেটওয়ার্ক ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যপথ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। ফলে এই নতুন পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

