ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার নিজের সরকারি বহর থেকেই জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ শুরু করলেন। পশ্চিম এশিয়াজুড়ে চলমান অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে সাশ্রয়ের আহ্বান জানানোর এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজের কনভয়ের গাড়ির সংখ্যা কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ ইতোমধ্যেই স্পেশ্যাল প্রোটেকশন গ্রুপের কাছে পৌঁছেছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস না করেই কনভয়ের গাড়ির সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির বদলে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের জন্য নতুন কোনো গাড়ি কেনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সরকারি সূত্রের দাবি, নির্দেশ পাওয়ার পর থেকেই এসপিজি বিষয়টি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, ভারতের রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শাসক দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও নিজেদের কনভয় ছোট করার পথে হাঁটতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ের বার্তা দিতে গিয়ে যদি সরকার নিজে বিলাসী বহর ব্যবহার চালিয়ে যায়, তাহলে সেই বার্তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। সম্ভবত সেই কারণেই মোদি এবার নিজের বহর থেকেই উদাহরণ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
এর আগে রোববার সেকেন্দরাবাদের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি সংযমী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল, সোনা, তামা ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার সচেতনভাবে করার অনুরোধ করেন। পরদিন সোমবার গুজরাটের ভদোদরায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির সময় শুরু হওয়া বৈশ্বিক সংকট এখন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত পরিস্থিতির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে মোদির এই আহ্বান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যমে কড়া সমালোচনা করে বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ত্যাগের বার্তা দেওয়া আসলে সরকারের ব্যর্থতারই প্রতিফলন। তাঁর অভিযোগ, জনগণকে বিদেশ ভ্রমণ কমানো, কম জ্বালানি ব্যবহার কিংবা বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া মানে অর্থনৈতিক চাপের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদির এই পদক্ষেপকে দুইভাবে দেখা হচ্ছে। একদিকে এটি জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব নীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব সামাল দিতে সরকার এখন প্রতীকী পদক্ষেপের আশ্রয় নিচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর জ্বালানি আমদানির চাপ আরও বাড়তে পারে। আর সেই কারণেই এখন থেকেই সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। মোদির কনভয় ছোট করার সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর বার্তারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

