ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের সমাধানে চীনের কোনো মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই—এমনই কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ বাড়ছে।
মঙ্গলবার, ১২ মে বেইজিংয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একাই ইরান ইস্যু সামাল দিতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই সংঘাত “শান্তিপূর্ণভাবে কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে” সমাধান করতে পারবে। অর্থাৎ, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিতও স্পষ্টভাবে উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, স্থায়ী সমাধানের পথে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একটি বিষয়ে আংশিক ঐকমত্যে পৌঁছান। সেটি হলো, কোনো দেশেরই আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অধিকার থাকা উচিত নয়। এই জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠকের আগে এই বিষয়টি সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। কারণ চীন ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এবং দেশটির সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতাদের একটি।
তবে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো আপত্তি বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি আরও কৌশলগত ও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান এই কৌশলগত জলপথে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে প্রতিবেশী দেশ ইরাক ও পাকিস্তান-এর সঙ্গে নতুন চুক্তিও করেছে। এতে অঞ্চলে ইরানের প্রভাব আরও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চূড়ান্ত বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, এই বৈঠককে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় আনতে পারবে। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসতে হবে—এই শর্ত পূরণ হলেই কেবল বড় ধরনের কোনো চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান পাল্টা অবস্থান আরও কঠোর করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া সংঘাতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। সোমবার ট্রাম্প এসব দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে, চীনকে বাদ রেখে সরাসরি শক্ত অবস্থান নেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও জটিল কূটনৈতিক মোড়ে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

