মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ টানাপোড়েন, যুদ্ধবিরতি আর পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তবে এবার সরাসরি কোনো আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্র-এর সামনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত তুলে ধরেছে তেহরান। ইরানের দাবি, এই শর্তগুলো পূরণ না হলে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসার প্রশ্নই আসে না।
মঙ্গলবার, ১২ মে ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার জন্য এই শর্তগুলোকে ‘ন্যূনতম আস্থা অর্জনের গ্যারান্টি’ হিসেবে দেখছে ইরান।
তেহরানের দেওয়া পাঁচটি শর্তের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, বিশেষ করে লেবাননে চলমান সংঘাত থামাতে হবে। পাশাপাশি ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাঁচটি শর্ত আসলে শুধু কূটনৈতিক দাবি নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী শক্তির অবস্থানও প্রকাশ করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরেই বহু বছর ধরে পশ্চিমা শক্তি ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চলে আসছে। এখন সেই ইস্যুকেই আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে তেহরান।
ইরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌ উপস্থিতি এবং অবরোধমূলক তৎপরতা বন্ধ হয়নি। এতে ওয়াশিংটনের প্রতি ইরানের অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছেও একই বার্তা পাঠিয়েছে তেহরান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় ফেরার জন্য একটি ন্যূনতম আস্থার পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এসব শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে, শুধু যুদ্ধ থামালেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বাস্তব পদক্ষেপও দরকার।
ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাব হিসেবেই এই পাঁচটি শর্ত সামনে এনেছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটনের প্রস্তাব ছিল পুরোপুরি একতরফা এবং যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয়নি—এমন লক্ষ্যগুলো আলোচনার মাধ্যমে আদায় করার চেষ্টা ছিল সেটি।
এরই মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত রোববার পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর পরই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আসে।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কয়েক মাস ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় আলোচনা চলাকালেই ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরাইলি যৌথবাহিনী। ইরানের দাবি অনুযায়ী, সেই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-সহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। একই দিনে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে ঘোষণা দেয় তেহরান।
এই ঘটনার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ইরান টানা ৩৯ দিনে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রায় ১০০ দফা হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। এরপর যুদ্ধ থামাতে ৭ এপ্রিল ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তবে সেই আলোচনা প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায় পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে। ১৩ এপ্রিল হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। পরে আরও এক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানো হলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো কাটেনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে গেছে। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

