যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল, কূটনৈতিক আলোচনাও চলছিল, কিন্তু বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি যেন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এবার লেবানন-এর দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে চালানো ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক সেনাসদস্য, এক শিশু এবং দুই উদ্ধারকর্মী।
মঙ্গলবার, ১২ মে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা চালানো হয়। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার বেশিরভাগই হয়েছে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে সাধারণ মানুষ এখনও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ সামলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নাবাতিয়া শহরে চালানো এক হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এছাড়া জেবচিত এলাকার কাছে আরেকটি হামলায় এক লেবানিজ সেনাসদস্য ও এক সিরীয় নাগরিকসহ চারজন প্রাণ হারান। অন্যদিকে বিন্ট জেবাইল এলাকায় তৃতীয় দফার হামলায় এক শিশু ও এক নারীসহ আরও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, হামলার পর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ শুরু করলে উদ্ধারকর্মীরাও হামলার শিকার হন। এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
গত ১৬ এপ্রিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণার পর অনেকেই আশা করেছিলেন সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে সংঘাত থামেনি। বরং ইসরাইলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহ-র মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এখনো চলছে।
ইসরাইলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে লেবাননের স্থানীয় প্রশাসন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আবাসিক এলাকা, রাস্তা, দোকানপাট ও উদ্ধারকাজেও হামলার প্রভাব পড়ছে।
বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে আরও বড় আঞ্চলিক উত্তেজনা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়।
এরপর থেকেই লেবানন-ইসরাইল সীমান্ত কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে এবং মার্চের শুরুতে আবার দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী বহু গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনও লেবাননের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এখন আর শুধু সীমান্ত লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে উভয় পক্ষের অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে সামান্য উত্তেজনাও আবার বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। দক্ষিণ লেবাননের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের স্কুল বন্ধ, হাসপাতালগুলো চাপের মুখে, আর প্রতিদিনই নতুন করে বাড়ছে হতাহত মানুষের সংখ্যা। যুদ্ধবিরতির কাগুজে ঘোষণা তাই এখন অনেকের কাছেই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

