মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। কারণ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর এই প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেছেন আরাগচি।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবুও এই সাক্ষাৎকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রসারণবাদী নীতি ও যুদ্ধবাজ মানসিকতার কারণে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, গত এক বছরে ইরান দুইবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের “অবৈধ ও নৃশংস আগ্রাসনের” শিকার হয়েছে।
আরাগচি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পেছনে যেসব অভিযোগ ওয়াশিংটন ও তেলআবিব তুলে ধরেছিল, সেগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এই ধরনের সামরিক অভিযান শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান মূলত আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক জোটের মঞ্চ ব্যবহার করে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অবস্থানও তুলে ধরছে তেহরান।
ভারতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি, বাণিজ্য, সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার কারণে ভারত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, এই সমুদ্রপথ দিয়েই ভারতের বড় অংশের জ্বালানি আমদানি হয়ে থাকে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লিতে আরাগচির এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়; বরং এটি ইরানের একটি কৌশলগত বার্তাও। পশ্চিমা চাপের মুখে তেহরান এখন এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। আর ভারতও এমন পরিস্থিতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী।
এই সফরের আরেকটি প্রতীকী দিকও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় এসেছে। বুধবার “মিনাব ১৬৮” নামের একটি বিমানে ভারতে পৌঁছান আরাগচি। ইরানের মিনাব এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত ১৬৮ শিশুর স্মরণে বিমানটির এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিষয়টিকে অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবেগঘন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তখন দিল্লিতে মোদি-আরাগচি বৈঠক ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

