দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রতিযোগিতা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের তৈরি অত্যাধুনিক ‘ফাতাহ-৪’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পাকিস্তানের দাবি, এটি ছিল একটি প্রশিক্ষণমূলক উৎক্ষেপণ, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর কার্যক্ষমতা যাচাই এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পরীক্ষা করা। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; বরং এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ইসলামাবাদের কৌশলগত অবস্থানও তুলে ধরছে।
আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রকেট ফোর্স কমান্ডের তত্ত্বাবধানে এই পরীক্ষা পরিচালিত হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটির লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা আগের তুলনায় আরও উন্নত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ‘ফাতাহ-৪’ অত্যাধুনিক এভিওনিক্স ও আধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তিতে সজ্জিত। ফলে এটি দীর্ঘ দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্দিষ্ট পাল্লা বা প্রযুক্তিগত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এটিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এই পরীক্ষার পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশংসা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান বর্তমানে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের সামরিক কৌশলের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি এক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের তৃতীয় বড় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। এর আগে গত ২৮ এপ্রিল পাকিস্তান ‘ফাতাহ-২’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালায়। আর তারও এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তান নৌবাহিনী তাদের জাহাজ-বিধ্বংসী আকাশ-উৎক্ষেপণকারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ‘তৈমুর’-এর সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করে।
ক্রমাগত এসব পরীক্ষা শুধু পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের দিকটিই তুলে ধরছে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক প্রতিযোগিতা ও পারমাণবিক সক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে এক পক্ষের সামরিক অগ্রগতি অন্য পক্ষকে পাল্টা প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশই নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে মনোযোগী হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোকেও সামরিক আধুনিকায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাগুলোকে তাই শুধু একটি দেশের সামরিক মহড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন শক্তির বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

