আফ্রিকার কয়েকটি দেশে আবারও আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস। বিশেষ করে কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডা-কে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকার শীর্ষ স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন অন্তত ৮০ জন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বেশিরভাগই স্বর্ণখনি অধ্যুষিত মঙ্গওয়ালু ও রওয়াম্পারা এলাকার বাসিন্দা। এসব এলাকায় মানুষের ঘন চলাচল এবং খনিশিল্পকেন্দ্রিক কার্যক্রমের কারণে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, কারণ ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়ে উগান্ডাতেও পৌঁছেছে। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গো থেকে আসা ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পরীক্ষায় তার শরীরে ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত থাকায় সংক্রমণ আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে পুরো মধ্য আফ্রিকাজুড়ে নতুন স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইবোলা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে বর্তমান কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র অঞ্চলে। ধারণা করা হয়, বাদুড় থেকে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এরপর শরীরের তরল পদার্থ, রক্ত বা ক্ষতস্থানের সংস্পর্শে এটি দ্রুত সংক্রমিত হয়।
রোগটির প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি ও গলাব্যথা দেখা দেয়। পরে বমি, ডায়রিয়া, তীব্র রক্তক্ষরণ এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, ইবোলায় গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ।
আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, মৃত ৮০ জনের মধ্যে চারজনের সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়া-তেও নতুন সন্দেহভাজন সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। যদিও সেগুলোর পরীক্ষার ফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বুনিয়ার মতো শহুরে এলাকা এবং মঙ্গওয়ালুর খনিশিল্পকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শহরাঞ্চলে ইবোলা ছড়িয়ে পড়লে মৃত্যুহার দ্রুত বেড়ে যায়।
যদিও কঙ্গো সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি, তবে আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে, তারা ডিআর কঙ্গো, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করছে। সেখানে সীমান্ত নজরদারি জোরদার, আক্রান্ত শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
গত ৫০ বছরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইবোলা ভাইরাসে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা যায় ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, যখন শুধু ডিআর কঙ্গোতেই প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ মারা যান। এছাড়া গত বছর দেশটির কাসাই প্রদেশেও আরেকটি প্রাদুর্ভাবে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
নতুন এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় আফ্রিকার বহু দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

