যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনীতি বোঝার জন্য অনেক সময় দীর্ঘ বিশ্লেষণের দরকার হয় না। কয়েকটি সংখ্যাই অনেক কিছু বলে দেয়। মাত্র সাত বছরে দেশটি পেয়েছে পাঁচ জন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের কেউই পূর্ণ একটি সংসদীয় মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। একই সময়ে পররাষ্ট্রসচিব হয়েছেন সাত জন, অর্থমন্ত্রী হয়েছেন ছয় জন, আর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বদলেছেন চার জন।
এই পরিসংখ্যান শুধু নেতৃত্ব বদলের গল্প নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। এমন এক সময়, যখন সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অর্থনীতি সামলাতে হয়, জনসেবার চাপ কমাতে হয়, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়—ঠিক তখনই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙে পড়ছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাজ্য কি সত্যিই শাসন করা কঠিন হয়ে পড়েছে? নাকি রাজনৈতিক দলগুলো, নেতৃত্ব, প্রশাসন, গণমাধ্যম, ভোটারদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে স্থিতিশীল সরকার চালানো আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন?
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এ ধারণা মানতে চান না। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাজ্য শাসন অযোগ্য নয়। বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা কেমি বেডেনকও একই সুরে বলেছেন, দেশটি শাসনের অযোগ্য নয়। কিন্তু কথার বাইরে বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংসদ সদস্যদের মধ্যেই নিজের নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে নীতি বাস্তবায়নের পথে প্রশাসনিক জটিলতা, আইনগত বাধা, পরামর্শপ্রক্রিয়া, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো সরকারের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে ভোটাররাও আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির। তাঁরা দ্রুত ফল চান, দ্রুত পরিবর্তন চান, কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা হলো—বড় সমস্যার সমাধান প্রায় কখনোই দ্রুত আসে না।
সংকটের পর সংকট
গত দেড় দশক যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই কঠিন ছিল। ২০০৮ সালের আর্থিক ধস, ব্রেক্সিট ঘিরে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, করোনাভাইরাস মহামারির অর্থনৈতিক আঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি দামের ধাক্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা—সব মিলিয়ে যে কোনো সরকারের জন্যই সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
এসব সংকট শুধু যুক্তরাজ্যের নয়। ইউরোপের বহু দেশেই ক্ষমতাসীন সরকারগুলো অর্থনৈতিক চাপ, জনঅসন্তোষ এবং দ্রুত ফল চাওয়া ভোটারদের মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবু যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আরও তীব্র, কারণ সেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন যেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশি দ্রুত ও অস্থির হয়ে উঠেছে।
ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্টের প্রধান হান্নাহ হোয়াইট মনে করেন, যুক্তরাজ্য শাসনের অযোগ্য নয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলো এমন সময়ে এমন সব প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছে, যাঁদের অনেকের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নেতৃত্বগুণের ঘাটতি ছিল। তাঁর মতে, একের পর এক সংকট যখন দ্রুত আঘাত করেছে, তখন শাসন আরও কঠিন করে তোলার মতো কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও সক্রিয় হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতি নিয়ে কাজ করা অধ্যাপক আনান্দ মেননও মনে করেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ব্রিটিশ ব্যবস্থায় সরকারের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকে। তাই পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকে। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে সেটি পুরো ব্যবস্থার অক্ষমতা নয়; বরং নেতৃত্বের ব্যর্থতা।
ইতিহাসবিদ স্যার অ্যান্থনি সেলডনের বিশ্লেষণ আরও সরাসরি। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী—যেমন বরিস জনসন, লিজ ট্রাস এবং স্যার কিয়ার স্টারমার—প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দক্ষতা পুরোপুরি দেখাতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা অনেক সময় অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার মতো বিনয়ও দেখাননি। অতীতে অনেক প্রধানমন্ত্রী পরামর্শদাতা ও রাজনৈতিক অভিভাবকের সহায়তা নিতেন। এমনকি মার্গারেট থ্যাচারের মতো শক্তিশালী নেতারও উইলি হোয়াইটলোর মতো ঘনিষ্ঠ সহায়ক ছিলেন।
প্রশাসন কি সহায়তা করছে, নাকি বাধা দিচ্ছে
নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি বড় বিতর্ক আছে—রাষ্ট্রযন্ত্র কি ঠিকভাবে কাজ করছে? অনেক রাজনীতিক মনে করেন, সিভিল সার্ভিস বা প্রশাসন সরকারের নীতি বাস্তবায়নে যথেষ্ট দ্রুত নয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক কাঠামো এত জটিল হয়ে উঠেছে যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বুঝতেই পারে না, সিদ্ধান্ত নেওয়া আর বাস্তবে কাজ করানো—এই দুইয়ের মধ্যে কত বড় ব্যবধান।
ডেভিড ক্যামেরনের সময় নীতিবিষয়ক দলে থাকা ব্যারনেস ক্যাভেনডিশ বলেছেন, প্রায় প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে বিস্মিত হয়—কেন কাজ করা এত কঠিন। তাঁর মতে, বর্তমান লেবার সরকারের অনেক মন্ত্রীও বুঝতে পারছেন, প্রশাসনের কিছু অংশে সংস্কারের প্রয়োজন আছে।
স্যার কিয়ার স্টারমার নিজেও গত ডিসেম্বর মাসে সংসদের লিয়াজোঁ কমিটির সামনে স্বীকার করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি কাজ বাস্তবায়নে হতাশা অনুভব করেন। তাঁর ভাষায়, কোনো একটি পদক্ষেপ নিতে গেলে নিয়মকানুন, পরামর্শপ্রক্রিয়া এবং দূরবর্তী সংস্থার এমন জট তৈরি হয় যে সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তব ফল আসতে অনেক বেশি সময় লাগে।
তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাল্টা যুক্তিও আছে। তাঁরা প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেন না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অনেকে বলেন—সমস্যা শুধু আমলাতন্ত্রে নয়, রাজনীতিকদের মধ্যেও। অনেক মন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিতে পারেন না, অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারেন না, আবার ব্যর্থতার দায় প্রশাসনের ওপর চাপান। এক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কঠোর ভাষায় বলেছেন, রাজনীতিকদের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি অবজ্ঞা এখন এত বেড়েছে যে তা পারস্পরিক অবিশ্বাসে রূপ নিয়েছে। ফলে নীতি বাস্তবায়নের যন্ত্রটাই ভীত ও সতর্ক হয়ে পড়েছে।
আরেকটি অভিযোগ হলো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিজেই আধুনিক সরকার চালানোর জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। একদিকে ক্ষমতা ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অন্যদিকে সেই কেন্দ্রীয় কাঠামো যথেষ্ট দক্ষ, বড় বা দ্রুত নয়। ফলে সিদ্ধান্ত জমে থাকে, মন্ত্রীরা দুর্বল হয়ে পড়েন, আর প্রশাসন অপেক্ষা করতে থাকে সংকেতের জন্য।
জন মেজরের সময় রাজনৈতিক সচিব থাকা লর্ড হিল মনে করেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং সংবাদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অতিমাত্রার ব্যস্ততা মন্ত্রীদের কাজকে দুর্বল করেছে। তাঁর মতে, এখন মন্ত্রী হওয়াটাই যেন আগের তুলনায় কম কার্যকর ও কম ক্ষমতাবান ভূমিকা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত রাজনীতি
রাজনীতির গতি এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত। আগে দলের ভেতরের অসন্তোষ জমতে সময় লাগত, বিদ্রোহ সংগঠিত হতে সময় লাগত, নীতি বিতর্কও তুলনামূলক ধীর ছিল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত বার্তা বিনিময়ের দল, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া গুজব ও মতামত রাজনীতির সময়কে সংকুচিত করে ফেলেছে।
টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সাবেক উপদেষ্টা থিও বার্ট্রামের মতে, দেশের বড় সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রায় ১০ বছর সময় দরকার। কিন্তু আজকের প্রধানমন্ত্রীদের হাতে সেই সময় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সবকিছু স্বল্পমেয়াদি হয়ে গেছে। মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়, দল দ্রুত চাপ তৈরি করে, গণমাধ্যম দ্রুত সংকটের ভাষা তৈরি করে।
সাবেক কনজারভেটিভ সংসদ সদস্য স্টিভ বেকার লিখেছেন, এখন হুইপ ও মন্ত্রীরা অনেক সময় এমন আলোচনায় পৌঁছান, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ঘণ্টা আগেই শেষ হয়ে গেছে। আগে যে বিদ্রোহ মাসের পর মাসে সংগঠিত হতো, এখন তা কয়েক দিনে গড়ে উঠতে পারে।
এই দ্রুততার মধ্যে নীতি নিয়ে গভীর আলোচনা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনীতিকেরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের বদলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সামলাতে ব্যস্ত থাকেন। সরকার নীতির ভাষা হারায়, আর বিরোধী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠী আবেগের ভাষা পেয়ে যায়।
গণমাধ্যম, নাটক আর রাজনৈতিক উত্তেজনা
কেউ কেউ মনে করেন, গণমাধ্যমও এই অস্থিরতার অংশ। রাজনৈতিক সাংবাদিকতা অনেক সময় নীতি বিশ্লেষণের চেয়ে নাটক, সংকট, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং ক্ষমতার খেলা নিয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ে। ফলে রাজনীতির স্বাভাবিক ওঠানামাও কখনো কখনো বড় সংকট হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিক ব্রায়ান্টের মতে, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের নাটকপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতা বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার চক্রকে আরও জোরালো করে। যখন প্রতিটি মতভেদকে নেতৃত্বের সংকট হিসেবে দেখা হয়, তখন সরকারের জন্য স্থিরভাবে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্রেক্সিটও এই সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। ব্রেক্সিট বিতর্ক কনজারভেটিভ পার্টিকে ভেতর থেকে বিভক্ত করেছিল। দলীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছিল, বিদ্রোহ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, নেতা বদলকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লেবার সংসদ সদস্যরাও কি সেই সংস্কৃতি দেখে শিখেছেন যে নেতাকে চাপে রাখা বা সরিয়ে দেওয়ার ভাবনা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ?
পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধোত্তর যুগে সংসদীয় বিদ্রোহ তুলনামূলক বিরল ছিল। কিন্তু জন মেজর, টনি ব্লেয়ার এবং জোট সরকারের সময় থেকে পেছনের সারির সংসদ সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, আর দলীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে।
দুই দলের আধিপত্যে ফাটল
যুক্তরাজ্যের রাজনীতির আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, লেবার ও কনজারভেটিভ—এই দুই প্রধান দলের ওপর মানুষের পুরোনো আস্থা দুর্বল হচ্ছে। ছোট দলগুলোর উত্থান প্রধান দুই দলের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। বর্তমান সরকারের সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে ঠিকই, কিন্তু ভোটের ভাগ তুলনামূলক কম। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বড় হলেও রাজনৈতিক ম্যান্ডেট অনেকের চোখে দুর্বল।
রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির প্রতি সমর্থন বাড়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে, ভোটাররা প্রচলিত রাজনীতির বাইরে বিকল্প খুঁজছেন। এতে ভবিষ্যতে সরকার গঠন বা স্থিতিশীলতা আরও কঠিন হতে পারে।
গর্ডন ব্রাউনের সাবেক উপদেষ্টা লর্ড উডের মতে, দুই প্রধান দলই ভেতরের সংকটে ভুগেছে। কনজারভেটিভদের ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট দলকে এমনভাবে ভাগ করেছিল যে দল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। আর ২০২৪ সালে লেবার বিপুল জয় পেলেও সেই বিজয়ের ভেতর আবেগ বা ঐক্যের ঘাটতি ছিল। স্পষ্ট শাসন কর্মসূচি দিয়ে দলকে একত্র করার কাজটি যথেষ্ট শক্তভাবে হয়নি।
কঠিন সত্য বলার সংকট
সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—কঠিন কথা বলা। রাজনীতি শুধু জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জায়গা নয়; কখনো কখনো জনগণকে বলতে হয়, সব চাওয়া একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাজ্যের সামনে এখন কয়েকটি বড় প্রশ্ন আছে। কল্যাণ ব্যয় কীভাবে সামলানো হবে? প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো হলে টাকা কোথা থেকে আসবে? জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে সংস্কার করা হবে? অর্থনীতিকে কীভাবে উৎপাদনশীল করা হবে? বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্বিন্যাস হবে?
এসব প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। কিন্তু রাজনীতিকেরা অনেক সময় সহজ উত্তর দেওয়ার ভান করেন। নির্বাচনের আগে কর বাড়ানো বা ব্যয় কমানোর কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট করে বলা হয় না। ফলে ক্ষমতায় এসে সরকার যখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে, তখন ভোটাররা মনে করেন তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
লর্ড হিলের মতে, রাজনীতির মূল কাজ হলো—আপনি কী চান তা ঠিক করা, তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো এবং সাধারণ নির্বাচনে যত বেশি সম্ভব মানুষকে সেই অবস্থানের পক্ষে আনা। কিন্তু এখন অনেক রাজনীতিক যেন উল্টো কাজ করেন। তাঁরা বিভিন্ন গোষ্ঠী কী চায় তা মেপে দেখেন, সবার মাঝামাঝি দিয়ে পথ বানাতে চান, তারপর কোনোভাবে যথেষ্ট ভোট জোগাড় করার চেষ্টা করেন। এতে নেতৃত্বের বদলে রাজনীতি এক ধরনের বড় লবিং যন্ত্রে পরিণত হয়।
থিও বার্ট্রামও বলেন, সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে নিজের দলের পেছনের সারির সংসদ সদস্যদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা, জনগণকে কঠিন কথা বলার সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি যুক্তি দাঁড় করানোর দক্ষতা কম দেখা গেছে।
ভোটাররাও কি বদলে গেছেন
এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না—ভোটাররা কি আগের চেয়ে বেশি অধৈর্য হয়ে পড়েছেন? আজকের সমাজে মানুষ দ্রুত সেবা পেতে অভ্যস্ত। অনলাইনে কিছু কিনলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দরজায় পৌঁছে যায়। তথ্য, বিনোদন, মতামত—সবকিছু তাৎক্ষণিক। সেই মানসিকতা রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
কিন্তু সরকার কোনো দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা নয়। অর্থনীতি ঘুরিয়ে দাঁড় করানো, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব কাজের ফল এক রাতের মধ্যে আসে না।
রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির মতো প্রতিষ্ঠাবিরোধী শক্তির প্রতি সমর্থন বাড়ার পেছনে ভোটারদের হতাশা বড় কারণ। অনেকেই মনে করেন, মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার জন মেজর বলেছেন, মানুষ জটিল সমস্যার দ্রুত ও সহজ উত্তর চায়, কারণ কেউ তাঁদের স্পষ্টভাবে বলছে না যে সবকিছুর সহজ সমাধান নেই। তাঁর মতে, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কখনো কখনো স্পষ্টভাবে “না” বলা।
অর্থনীতি, প্রত্যাশা ও সীমিত সুযোগ
অতীতে সরকার অনেক সময় টাকা খরচ করে রাজনৈতিক চাপ কমাতে পারত। ডানপন্থী সরকার কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিত, বামপন্থী সরকার কল্যাণ খাতে ব্যয় বাড়াত। কিন্তু এখন দুই পথই কঠিন। অযাচিত করছাড়ের প্রতিশ্রুতি আর্থিক বাজারকে অস্থির করে, আবার ঋণ বাড়িয়ে ব্যয় করার ইঙ্গিতও একইভাবে উদ্বেগ তৈরি করে।
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ ঋণ এবং বাস্তব আয়ের স্থবিরতার সমস্যায় আটকে আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষকে চাপে রেখেছে। কনজারভেটিভরা ব্রেক্সিট-পরবর্তী সমৃদ্ধির আশা দেখিয়েছিল, লেবার প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দ্রুত আসেনি।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষ মনে করে সরকার তাদের জন্য কাজ করছে না। আর যখন নাগরিকরা মনে করতে শুরু করে যে সরকার ফল দিতে পারছে না, তখন শাসন আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
হান্নাহ হোয়াইটের মতে, জনসেবার ওপর চাপ বাড়ছে, মানুষের প্রত্যাশা উঁচু, কিন্তু সরকারের হাতে কাজ করার জায়গা সীমিত। মহামারির সময় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জ্বালানি সংকটে সরকার বড় হস্তক্ষেপ করেছিল। ফলে অনেক মানুষ এখন প্রশ্ন করে—আজ জীবনযাত্রার ব্যয় যখন এত বেশি, তখন সরকার কেন একইভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারছে না? বাস্তবতা হলো, অর্থের অভাব নীতিগত পছন্দকে কঠোরভাবে সীমিত করে।
স্যার অ্যান্থনি সেলডন সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে যদি অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক সংকট একসঙ্গে দেখা দেয়। অতীতে আর্থিক সংকট হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে একই মাত্রার রাজনৈতিক অস্থিরতা সব সময় ছিল না। দুটি একসঙ্গে হলে তা অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
পথ কোথায়
এই অস্থিরতা থেকে বের হওয়ার পথ কী? শুধু নেতা বদল করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? ইতিহাস বলছে, না। নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেই পুরোনো অর্থনীতি বদলায় না, প্রশাসনিক কাঠামো সহজ হয় না, ভোটারের প্রত্যাশা কমে না, সংসদ সদস্যদের বিদ্রোহী মনোভাব মুছে যায় না।
লর্ড উড মনে করেন, নেতাদের কঠিন সত্য বলার সাহস থাকতে হবে। বিশেষ করে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বাস্তবতা নিয়ে জনগণের সঙ্গে সৎ হতে হবে। একই সঙ্গে এমন কর্মসূচি দরকার, যা পরিষ্কার বিশ্বদৃষ্টি, চেনা মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত আশাবাদ তৈরি করতে পারে।
স্যার জন মেজরও সোজাসাপ্টা কথার পক্ষে। তাঁর মতে, দেশের বহু মানুষ এমন রাজনীতিকের কথা শুনতে প্রস্তুত, যিনি স্পষ্টভাবে বলবেন সমস্যার গভীরতা কতটা এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
কিন্তু শুধু নেতাদের সাহস থাকলেই হবে না। ভোটারদেরও কঠিন বিনিময় মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বীকার করতে হবে যে জনপ্রিয়তার জন্য সবসময় সহজ প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় না। আর প্রধানমন্ত্রীদেরও ক্ষমতায় টিকে থাকার মতো স্থায়িত্ব দরকার, যাতে তাঁরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময় পান।
বর্তমান বাস্তবতা হলো, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে স্থায়িত্ব এখন বিরল জিনিস। পাঁচ প্রধানমন্ত্রী সাত বছরে—এই সংখ্যা শুধু অতীতের হিসাব নয়, ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত। দেশটি শাসন অযোগ্য হয়ে গেছে—এ কথা হয়তো অতিরঞ্জিত। কিন্তু দেশটি শাসন করা যে আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত সংকটটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়, শুধু দলের নয়, শুধু প্রশাসনেরও নয়। এটি নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান, ভোটার প্রত্যাশা, গণমাধ্যমের সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত সংকট। সমাধানও তাই এক জায়গা থেকে আসবে না। দরকার সৎ নেতৃত্ব, বাস্তববাদী প্রতিশ্রুতি, কার্যকর প্রশাসন এবং এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে দ্রুত উত্তেজনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তত দিন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়তো অস্থিরই থাকবে। আর স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিশ্চিন্তে টিকে থাকবে হয়তো সেই বিখ্যাত বিড়াল, ল্যারি—যে নেতাদের আসতে-যেতে দেখে, কিন্তু নিজে জায়গা ছাড়ে না।

