রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৫ মাসেরও বেশি সময় পার করেছেন। কিন্তু এই সময়টুকুর মধ্যেই তার আচরণ, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির নানা মুহূর্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেউ কেউ বিষয়টিকে ট্রাম্পের পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকের মতে, বিষয়টি এখন আর শুধু নাটকীয়তা বা প্রচারের কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নেতৃত্বের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—তিনি কি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম? প্রশ্নটি শুধু বিরোধী শিবিরে নয়, সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আলোচিত হচ্ছে। এমনকি তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অস্বস্তির আভাস মিলছে।
এই প্রেক্ষাপটে আবার আলোচনায় এসেছে মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী। এই সংশোধনীর চতুর্থ ধারায় এমন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট নিজে দায়িত্ব ছাড়তে না চাইলেও যদি তাকে দায়িত্ব পালনের জন্য অযোগ্য বা অক্ষম মনে করা হয়, তাহলে তাকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। তবে বাস্তবে এই পথ অত্যন্ত জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
১১ই মে, সোমবার: এক দিনের ঘটনাই কেন এত আলোচিত
ট্রাম্পকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে গত ১১ই মে, সোমবারের কয়েকটি ঘটনা। ওই দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য ও আচরণ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করে।
দিনের শুরুতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন ট্রাম্প। অনুষ্ঠানটির মূল বিষয় ছিল স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজনন-সংশ্লিষ্ট নীতি। কিন্তু সেখানে আলোচনার ধারার সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক না রেখে তিনি ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য বানানোর পরিকল্পনার কথা বলেন।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে আসে, যখন কিছুদিন আগেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার দাবি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেকেই অস্বাভাবিক এবং কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন।
এরপর তিনি নিজেকে প্রজনন ক্ষমতার রাজা হিসেবে আখ্যা দেন। একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠানে এমন আত্মপ্রশংসামূলক ও অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য উপস্থিতদের অনেককেই বিস্মিত করে। একই অনুষ্ঠানে তিনি পররাষ্ট্রনীতি, শুল্ক, ওষুধের দামসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন। ওষুধের দাম ৫০০-৬০০ শতাংশ কমানোর দাবিও করেন তিনি, যা প্রতিবেদনে মিথ্যা দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় আরেকটি মুহূর্ত। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তাকে নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প অতীতে জো বাইডেনকে বারবার ঘুমকাতুরে ও বয়সজনিত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তাই একই ধরনের পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নিজেই সমালোচনার মুখে পড়েন। তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনি ঘুমাননি; বরং চোখ পিটপিট করে তাকিয়েছিলেন।
বিকেলের অনুষ্ঠানে স্মৃতিশক্তি নিয়ে প্রশ্ন
দিনের দ্বিতীয় অংশেও বিতর্ক থামেনি। বিকাল ৪টার দিকে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ অংশের উঠানে চলতি বছরের এনসিএএ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ী ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন ট্রাম্প।
সেখানে দলের ফুটবল কোচ কার্ট সিগনেত্তির পাশে দাঁড়িয়েও তাকে চিনতে না পারার ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। অথচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিগনেত্তির সঙ্গে ট্রাম্পের আগেই পরিচয় হয়েছিল এবং তাদের একাধিকবার কথা হয়েছে।
রাজনীতিতে স্মৃতিভ্রংশ বা ভুলে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু যখন বিষয়টি একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ঘিরে ঘটে, তখন তা ব্যক্তিগত ভুলের সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে ট্রাম্পের বয়স এবং সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে যখন আগে থেকেই বিতর্ক চলছে, তখন এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে আরও বড় হয়ে ওঠে।
এক ঘণ্টার কম সময়ে ৫০টির বেশি পোস্ট
দিনের শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের আচরণ আরও আলোচিত হয়ে ওঠে। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তিনি ৫০টির বেশি পোস্ট দেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, এসব পোস্টে তিনি ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে পুরোনো দাবি আবার তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, ডমিনিয়ন ভোট মেশিন তার পক্ষে পড়া লাখো ভোট মুছে দিয়েছে। কিন্তু এই দাবি বহু আগেই তথ্য যাচাইকারীরা মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় এক দশক আগের হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল সার্ভার বিতর্কও আবার সামনে আনেন। একই সঙ্গে নিজের দলের এক এমপিকে ঘিরে ওঠা ভুয়া অভিযোগ খণ্ডনের চেষ্টা করেন, যদিও অভিযোগটি ভুয়া হওয়ায় তার ব্যাখ্যাও তেমন প্রাসঙ্গিকতা পায়নি।
এরপর তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কয়েকটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি শেয়ার করেন, যেখানে পরিচিত ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিদ্রূপ করা হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য অবমাননাকর তিনটি ভিডিও শেয়ার করার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যে একটি ভিডিওর শিরোনামে ধান্দাবাজির ইঙ্গিত ছিল, যা অনেকের চোখে বর্ণবাদী ইঙ্গিত বহন করে।
আরও দুইটি পৃথক পোস্টে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান ট্রাম্প। একজন বর্তমান প্রেসিডেন্ট যখন কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করেন, তখন তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় থাকে না; বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় শালীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।
রোজ গার্ডেন ডিনারে নিজের কার্যালয় নিয়েই বিতর্ক
সেদিন সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে রোজ গার্ডেন ডিনার অনুষ্ঠানে যোগ দেন ট্রাম্প। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সম্মান জানাতে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়।
এ ধরনের অনুষ্ঠানে সাধারণত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা প্রত্যাশিত থাকে। কিন্তু ট্রাম্প সেখানে নিজের সাফল্য তুলে ধরতে গিয়ে হোয়াইট হাউসের আগের অবস্থা নিয়ে কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন।
তিনি দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় আসার আগে ভবনটির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। সংস্কারের খরচ নিজে বহন করেছেন বলেও জানান। তার বক্তব্যে হোয়াইট হাউসকে পরোক্ষভাবে অত্যন্ত নাজুক ও নিম্নমানের জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি জানান, স্তম্ভ ভেঙে পড়ছিল, পলেস্তারা খসে পড়ছিল এবং এখন সব জায়গায় নতুন ও সুন্দর পাথর বসানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় শুধু একটি ভবন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ইতিহাস ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। তাই নিজ কার্যালয় নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহারে অনেকে বিস্মিত হন। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষার বদলে ব্যক্তিগত আত্মপ্রচারের প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে।
আচরণ কি হঠাৎ বদলেছে, নাকি পুরোনো প্রবণতার নতুন রূপ?
ট্রাম্পকে নিয়ে এই বিতর্ক একদিনে তৈরি হয়নি। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অশ্লীল ও অসংলগ্ন কথাবার্তায় তার প্রকৃত চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক মার্কিনি যেন ধরে নিয়েছেন—ট্রাম্প এমনই। তিনি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবেন, আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করবেন, ভুল তথ্য দেবেন, অস্বাভাবিক দাবি করবেন—এগুলো যেন তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।
কিন্তু এখানেই মূল সমস্যা। কোনো রাজনৈতিক নেতার অস্বাভাবিক আচরণ যদি বারবার ঘটতে ঘটতে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে জনজবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ তখন প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। আর সেই জায়গাটাই একটি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ইরান, পাকিস্তান ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে অস্থির বার্তা
গত কয়েক মাসে ট্রাম্পের আরও কিছু বক্তব্য তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে। এপ্রিলে তিনি বারবার দাবি করেন, ইরান তার সব দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ পর্যন্ত সেই দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এরপর তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য দরকষাকষির উদ্দেশ্যে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের উদ্দেশে উড়োজাহাজে রওনা হয়েছেন। পরে জানা যায়, ভ্যান্স তখনও উড়োজাহাজে ওঠেননি। এমনকি পরবর্তীতে সেই সফর বাতিলও হয়।
খ্রিস্টানদের পবিত্র ছুটির দিন ইস্টার সানডের সকালে ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে ইরানের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেন। সমালোচকদের মতে, সেই বার্তা এতটাই অসংলগ্ন ছিল যে তার মানসিক স্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ওই পোস্টে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বলেন।
৪৮ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। তিনি ইরানের ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার হুমকি দেন। তার বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না হলে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কেউ তাদের আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুতর। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে যুদ্ধ, ধ্বংস বা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হুমকি শুধু ভাষাগত অতিরঞ্জন হিসেবে দেখা যায় না। এটি বাজার, কূটনীতি, সামরিক প্রস্তুতি এবং মিত্রদেশগুলোর অবস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
১ মে ফ্লোরিডার বক্তব্য এবং মাইক্রোফোন বিতর্ক
এ মাসের শুরুতেও কয়েকবার ট্রাম্পকে বক্তব্য দেওয়ার সময় অসংলগ্ন মনে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১ মে ফ্লোরিডার কয়েকটি গ্রামে বক্তব্য রাখার সময় তিনি একাধিকবার গালিগালাজ করেন। পরে একটি বিকল মাইক্রোফোন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি চিৎকার করে বিষোদগার করেন।
সাধারণ রাজনৈতিক উত্তেজনা আর ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন প্রেসিডেন্টকে শুধু সমর্থকদের উজ্জীবিত করলেই হয় না; তাকে সংকটের মুহূর্তে স্থির, সংযত এবং দায়িত্বশীল বলেও মনে হতে হয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে যাচ্ছে।
কেন এতদিন এই আচরণ সহ্য করা হলো
সিএনএনের প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বহু বছর ধরে ট্রাম্প যেন নিজেই আমেরিকান জনগণকে তার অস্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলেছেন।
তিনি যখন ভুল বলেন, সমর্থকদের বড় অংশ সেটিকে কৌশল বলে ব্যাখ্যা করে। তিনি যখন আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন, অনেকে বলেন তিনি সোজাসাপটা কথা বলেন। তিনি যখন অসংলগ্নভাবে বিষয় বদলান, তখন সেটিকে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে এক ধরনের ‘ট্রাম্পীয়’ ধরন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় কয়েকটি বক্তব্যে ট্রাম্পকে অসংলগ্নভাবে নানা বিষয় জুড়ে কথা বলতে দেখা যায়। পরে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেন, তিনি নয়টি ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং সেগুলো একসঙ্গে একটি বড় বার্তা তৈরি করে। মজা করে তিনি আরও বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই এমনভাবে কথা বলেন, যাতে সবাই সহজে বুঝতে না পারে।
এই ব্যাখ্যা তার সমর্থকদের কাছে রসিকতা বা আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ মনে হতে পারে। কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি অসংলগ্নতা ঢাকার চেষ্টা।
ভুল তথ্যের দীর্ঘ ইতিহাস
ট্রাম্পের বক্তব্যে ভুল তথ্য নতুন কিছু নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি ৩০ হাজার মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করেছেন। এই সংখ্যা এত বড় যে, এখন অনেকের কাছে ট্রাম্পের ভুল তথ্য দেওয়া আর সংবাদমূল্য বহন করে না।
এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। যখন কোনো নেতা নিয়মিত ভুল তথ্য দেন, তখন একসময় জনগণ বিস্মিত হওয়া বন্ধ করে দেয়। সংবাদমাধ্যমও প্রতিটি ভুল দাবিকে আলাদা করে বড় খবর হিসেবে তুলে ধরে না। ফলে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
ট্রাম্পের নতুন কোনো বক্তব্য এখন অনেকের কাছে দুটি প্রশ্ন তৈরি করে—এটি কি রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত বিভ্রান্তি, নাকি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি? এই বিভ্রান্তিই তার রাজনীতির বড় অস্ত্র, আবার একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগও।
জনমত জরিপে বাড়ছে অস্বস্তি
সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপ বলছে, মার্কিনিদের ধৈর্য কমছে। ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ মিলিয়ে জনমতের চিত্র আরও জটিল হয়ে উঠছে।
রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন বয়সের সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণ আরও অসংযত হয়ে পড়ছে। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও ৩০ শতাংশ মানুষ একই মত দিয়েছেন।
আরেক জরিপে দেখা যায়, ৭১ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন ট্রাম্পের আচরণে ধারাবাহিকতা নেই। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ৬২ শতাংশ মানুষ এমন ভাবতেন। অর্থাৎ উদ্বেগের হার বেড়েছে।
গত মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট, এবিসি নিউজ ও ইপসোসের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা হারিয়েছেন ট্রাম্প। ২০২৩ সালে এমন মনে করতেন ৪৩ শতাংশ মানুষ। এই ব্যবধান শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার অবনতির ইঙ্গিত।
একই জরিপে আরও বলা হয়েছে, ৬৭ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক বিবেচনায় নেন না। ৩০ শতাংশ রিপাবলিকানও একই মত দিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো শুধু বিরোধীদের অভিযোগ নয়। এগুলো সাধারণ ভোটার, এমনকি ট্রাম্পের দলীয় ভিত্তির ভেতরেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
২৫তম সংশোধনী কি বাস্তব সমাধান হতে পারে?
ট্রাম্পকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২৫তম সংশোধনীর প্রসঙ্গ আবার সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এই সংশোধনী প্রেসিডেন্টের অক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি সাংবিধানিক পথ দেখায়। কিন্তু বাস্তবে এটি কার্যকর করা সহজ নয়।
কারণ প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য বা অক্ষম ঘোষণা করার প্রশ্ন শুধু আইনগত নয়, রাজনৈতিকও। এর জন্য প্রশাসনের ভেতর থেকে শক্ত অবস্থান দরকার, একই সঙ্গে কংগ্রেসের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই পথ খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না।
তারপরও বিষয়টি আলোচনায় আসা নিজেই একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত। সাধারণত কোনো প্রেসিডেন্টের আচরণ নিয়ে এমন পর্যায়ের আলোচনা তখনই হয়, যখন তার নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে।
জুনে ৮০ বছরে পা রাখবেন ট্রাম্প
ট্রাম্প জুনে ৮০ বছরে পা রাখবেন। বয়স একা কোনো নেতার সক্ষমতা নির্ধারণ করে না। অনেক প্রবীণ নেতা অভিজ্ঞতা, স্থিরতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু বয়সের সঙ্গে যদি আচরণে অস্থিরতা, বক্তব্যে অসংলগ্নতা এবং সিদ্ধান্তে হঠকারিতা যুক্ত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প বহু বছর ধরেই আক্রমণাত্মক, অশালীন ও অসংযত বক্তব্য দিয়ে এসেছেন। তিনি একজন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, ব্যবসায়ী এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চেয়েছেন। তার রাজনৈতিক উত্থানেও এই নাটকীয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু প্রচারের কৌশল আর রাষ্ট্র পরিচালনার আচরণ এক নয়। নির্বাচনী মঞ্চে যেটি দর্শক টানে, ওভাল অফিসে সেটিই কখনও কখনও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রেসিডেন্টের প্রতিটি শব্দ বাজার, যুদ্ধ, কূটনীতি, প্রশাসন এবং জনগণের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নভেম্বরের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন কি মোড় ঘোরাবে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নভেম্বরের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনে ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের সবগুলোতে ভোট হবে। পাশাপাশি উচ্চকক্ষ সিনেটের এক তৃতীয়াংশ আসনেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
যদি জনমত জরিপে দেখা উদ্বেগ ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়, তাহলে ডেমোক্র্যাটরা নতুন রাজনৈতিক সুযোগ পেতে পারে। তারা কংগ্রেসে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলে ট্রাম্পকে চাপে রাখার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পথ খুঁজে পেতে পারে।
তবে সবকিছু নির্ভর করবে মার্কিন ভোটারদের ওপর। তারা কি ট্রাম্পের আচরণকে আগের মতোই রাজনৈতিক নাটক হিসেবে মেনে নেবে, নাকি এটিকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে দেখবে—এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রাজনীতি নির্ধারণ করতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাজনীতির প্রচলিত নিয়ম ভেঙে চলেছেন। তার সমর্থকদের কাছে তিনি সাহসী, সরাসরি এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কণ্ঠ। সমালোচকদের কাছে তিনি অস্থির, অসংযত এবং ক্ষমতার জন্য বিপজ্জনক।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই পুরোনো বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু ট্রাম্প কী বললেন বা কী করলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—তার আচরণ কি যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে?
৬১ শতাংশ মার্কিনি যদি মনে করেন বয়সের সঙ্গে তার আচরণ আরও অসংযত হচ্ছে, ৭১ শতাংশ যদি আচরণে ধারাবাহিকতার অভাব দেখেন, ৫৯ শতাংশ যদি মনে করেন তিনি প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা হারিয়েছেন, এবং ৬৭ শতাংশ যদি মনে করেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে সব দিক বিবেচনা করেন না—তাহলে বিষয়টি আর ছোটখাটো রাজনৈতিক কোলাহল নয়।
ট্রাম্প হয়তো আগেও অনেক বিতর্ক পেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক নেতার মতো তার ক্ষেত্রেও জনধৈর্যের একটি সীমা আছে। সেই সীমা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা হয়তো নভেম্বরের নির্বাচনের ফলেই প্রথম স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
সিভি/এইচএম

