ইসরায়েলকে ঘিরে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এখন এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশের কাছে দেশটি ছিল কৌশলগত মিত্র, নিরাপত্তা-সহযোগী এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অবস্থান দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গাজা, ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক ভূমিকা ও আগ্রাসী অবস্থান বিশ্বমঞ্চে দেশটির গ্রহণযোগ্যতাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ভেতরেও অস্বস্তি বাড়ছে। শুধু বিদেশি সরকার বা মানবাধিকার সংগঠন নয়, সাধারণ ইসরায়েলিরাও বুঝতে পারছেন, তাদের দেশের ভাবমূর্তি আর আগের জায়গায় নেই। ২০২৫ সালে পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, বিশ্ববাসীর কাছে তাদের দেশ সম্মান হারিয়েছে। বিপরীতে মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেন, ইসরায়েলের প্রতি এখনো কিছুটা সম্মান টিকে আছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু জনমতের হিসাব নয়; এগুলো ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত। কারণ, যখন একটি দেশের নাগরিকরাই মনে করতে শুরু করেন যে তাদের রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন সেই অস্বস্তি ভোটের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে। আর সেই সুযোগই নিতে চাইছেন ইসরায়েলের দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ।
নেতানিয়াহুকে সরানোর রাজনীতি
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। তার সমর্থকেরা তাকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের চোখে তিনি ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার অন্যতম বড় কারণ। গাজায় সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান, ইরান ও লেবানন ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ নীতি এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
এই প্রেক্ষাপটে নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ একজোট হয়েছেন। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে হারিয়ে নতুন সরকার গঠন করা। তারা দাবি করছেন, ইসরায়েলকে আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হলে নেতৃত্বে পরিবর্তন দরকার।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। শুধু নেতৃত্ব বদলালেই কি ইসরায়েলের ভাবমূর্তি বদলাবে? নাকি সমস্যা আরও গভীরে, রাষ্ট্রীয় নীতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে?
বেনেট ও লাপিদ নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করলেও তার যুদ্ধ-সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা তারা স্পষ্টভাবে করেননি। এ কারণেই বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বেনেট-লাপিদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নয়। তাদের ভাষা আলাদা হতে পারে, নেতৃত্বের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-রাজনীতির মূল কাঠামো একই রকম থেকে যেতে পারে।
গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলের ভাবমূর্তির পতন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ওই সংঘাতে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চললেও গাজা থেকে প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর আসছে। ফলে ইসরায়েলের প্রতি বৈশ্বিক ক্ষোভ কমার বদলে আরও গভীর হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি ইসরায়েলের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ হয়েছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো তদন্ত দাবি করেছে, আর বহু রাষ্ট্র ইসরায়েলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছে।
জাতিসংঘের তদন্তে গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। ইউরোপে স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা বাতিলের চাপ বাড়ছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও, যেটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে পরিচিত, জনমত বদলাচ্ছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যেই ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। শুধু ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে তেল আবিবের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র: ব্যতিক্রমী মিত্র, কিন্তু কতদিন?
বিশ্বের অনেক দেশ ইসরায়েল থেকে দূরত্ব তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বড় ব্যতিক্রম। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন নজির তৈরি করেছে।
ইরানকে ইসরায়েল বহুদিন ধরেই পুরনো শত্রু হিসেবে দেখে। কিন্তু ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট সরাসরি ইরানে হামলার এমন উদ্যোগ নেননি। এই দিক থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আগের মার্কিন নীতির তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকলেই যে ইসরায়েল নিরাপদ কূটনৈতিক অবস্থানে থাকবে, তা বলা কঠিন। কারণ, জনমত ও সরকারী নীতির মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, ততই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। আজ ট্রাম্প-নেতানিয়াহু একে অপরকে বন্ধু বলছেন, কিন্তু রাজনৈতিক সম্পর্ক সব সময় ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে টেকে না। ক্ষমতার ভারসাম্য, জনমত, নির্বাচনী হিসাব এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সবই একসময় সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশানসের পলিসি ফেলো বেথ ওপেনহাইম কাতারভিত্তিক আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েল এখন একঘরে হয়ে যাচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনমত জরিপের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পশ্চিমা সমাজেও ইসরায়েল সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব বাড়ছে।
তার মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বন্ধুত্বের কথা বললেও ইরান ও লেবানন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে ইসরায়েলের জন্য বিব্রতকর কয়েকটি মন্তব্যও করেছেন।
ইউরোপের দ্বিধা
ইউরোপে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমছে, কিন্তু তবু ইউরোপীয় সরকারগুলো একসঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট-স্মৃতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, অস্ত্র বাণিজ্য, গোয়েন্দা তথ্যের বিনিময়, প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং নজরদারি সফটওয়্যার—এসব কারণে বহু পশ্চিমা সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে অনিচ্ছুক।
বেথ ওপেনহাইমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়লেও অনেক সরকার এখনো আশা করছে, তাদের যেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিতে না হয়। তারা হয়তো অপেক্ষা করছে—নেতানিয়াহু সরে গেলে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আবার নতুনভাবে সাজানো যাবে।
এই জায়গাতেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি নেতানিয়াহুর পরিবর্তে তুলনামূলক কম যুদ্ধংদেহী কোনো সরকার আসে, পশ্চিমা দেশগুলো সেটিকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে নিতে পারে। এতে তারা বলতে পারবে, ইসরায়েল বদলাচ্ছে, তাই সম্পর্কও নতুন করে শুরু করা যায়।
কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু মুখ বদলালে কি নীতি বদলাবে? আর নীতি না বদলালে কতদিন এই নতুন সম্পর্ক টিকবে?
বেনেটের ‘সংস্কারের যুগ’ প্রতিশ্রুতি
ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরের মধ্যে দেশটির সাধারণ নির্বাচন শুরু হতে হবে। এর আগে এপ্রিলে কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদ নাফতালি বেনেট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি ভোটারদের সামনে ‘সংস্কারের যুগ’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বেনেটের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই যুগে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন পেশাদার মানুষেরা, যাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে ইসরায়েলের মঙ্গল নিশ্চিত করা। তিনি নেতানিয়াহুর আমলে সমাজে বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কথা তুলে ধরে নতুন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এই বক্তব্য ভোটারদের একটি অংশের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিনের সংঘাত, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনে ক্লান্ত মানুষেরা পরিবর্তনের ভাষা শুনতে চান। তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা ইসরায়েলকে আবার সম্মানের জায়গায় ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু বেনেটের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান ও বর্তমান বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নে খুব নরম কোনো অবস্থানের প্রতিনিধি নন। ফলে তার নেতৃত্বে সরকার এলে ইসরায়েলের ভাষা বদলাতে পারে, কূটনৈতিক ভঙ্গি বদলাতে পারে, কিন্তু বাস্তব নীতি কতটা বদলাবে—তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
লাপিদ ও বেনেট: বিকল্প, নাকি একই নীতির নতুন রূপ?
ইয়াইর লাপিদ নিজেকে অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি ও কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভাষা নেতানিয়াহুর তুলনায় অনেক কম সংঘাতমুখী বলে মনে হতে পারে। অন্যদিকে বেনেটের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত।
দুই নেতার এই জোট তাই একদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী শক্তিকে একত্র করতে পারে, অন্যদিকে ভোটারদের সামনে একটি বাস্তবসম্মত ক্ষমতার বিকল্পও তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—তারা কি সত্যিই ইসরায়েলের নীতি বদলাতে চান, নাকি শুধু নেতানিয়াহুকে সরিয়ে একই রাষ্ট্রীয় কৌশল নতুন মুখে চালিয়ে যেতে চান?
সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তার মতে, লাপিদ ও বেনেট হয়তো ধরে নিয়েছেন, বিশ্বের মানুষ মূলত নেতানিয়াহুকেই ঘৃণা করে—ইসরায়েলকে নয়।
এই ধারণা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। কারণ, এতে সমস্যার দায় একজন ব্যক্তির ওপর চাপানো যায়। বলা যায়, নেতানিয়াহু সরে গেলেই ইসরায়েল আবার গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। যদি ফিলিস্তিন, গাজা, লেবানন, হরমুজ প্রণালি ও ইরান নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান একই থাকে, তাহলে কেবল নেতৃত্ব বদলে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ থামানো কঠিন হবে।
পিনকাসও বলেছেন, নতুন নেতারা নেতানিয়াহুর তুলনায় ভালো না খারাপ—সেটাই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, দুই সরকারের নীতিগত ব্যবধান কতটা হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, লাপিদ ও বেনেট লেবানন, হরমুজ প্রণালি, এমনকি ইরান নিয়েও ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলেননি।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে। নেতানিয়াহু বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে হাসি-ঠাট্টা করলেও বিশ্বের বহু মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা।
বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে সম্মান জানাবে। অর্থাৎ নেতানিয়াহু তাদের ভূখণ্ডে পা রাখলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এমনকি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও বলেছেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তার হবেন।
একজন রাষ্ট্রনেতার জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সংকট নয়; এটি পুরো দেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ, বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ট্রাম্পের ভূমিকা: নেতানিয়াহুর জন্য আশীর্বাদ, নাকি অনিশ্চয়তা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিচেল বারাকের মতে, বেনেট ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে পারেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরায়েলি রাজনীতিতে এখনো বড় শক্তি।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় প্রভাব ধরে রেখেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক চরিত্র অনিশ্চিত। তিনি শক্তিশালী ও বিজয়ী নেতাদের পাশে থাকতে পছন্দ করেন, পরাজিতদের নয়—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল। যদি মনে হয় নেতানিয়াহু নির্বাচনে দুর্বল হয়ে পড়ছেন, তাহলে ট্রাম্প তার সমর্থন সরিয়ে অন্য সম্ভাব্য নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকতেও পারেন।
এটি নেতানিয়াহুর জন্য বড় ঝুঁকি। কারণ, তার আন্তর্জাতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন। সেই ভিত্তিতে ফাটল ধরলে দেশীয় রাজনীতিতেও তার অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
সরকার বদলালেই কি সংকট কাটবে?
ইসরায়েলের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে আছে দুটি স্তর। প্রথমটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক—নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, তার রাজনৈতিক কৌশল, দুর্নীতির অভিযোগ, বিচারিক সংকট, যুদ্ধনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান। দ্বিতীয়টি কাঠামোগত—ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নীতি, দখলদারিত্ব, নিরাপত্তা-যুক্তি, সামরিক অভিযান, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং পশ্চিমা মিত্রতার ওপর নির্ভরতা।
বেনেট ও লাপিদ প্রথম স্তরটি বদলাতে চান। তারা বলতে চান, নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে বিভক্ত করেছেন, একঘরে করেছেন, বিশ্বমঞ্চে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছেন। তাই তাকে সরানো দরকার।
কিন্তু দ্বিতীয় স্তরটি—অর্থাৎ নীতির গভীর কাঠামো—তারা কতটা বদলাতে চান, তা স্পষ্ট নয়। আর এখানেই তাদের রাজনৈতিক প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা।
যদি গাজা, ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরান নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান আগের মতোই থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাময়িক স্বস্তি আসলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটবে না। পশ্চিমা সরকারগুলো হয়তো নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের স্মৃতি এত সহজে মুছে যাবে না। গাজায় নিহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক বিপর্যয়—এসব কোনো কূটনৈতিক ভাষণে ঢেকে রাখা যায় না।
ভাবমূর্তি বদলাতে হলে কী দরকার?
ইসরায়েলের ভাবমূর্তি বদলাতে হলে শুধু নতুন প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট নয়। দরকার নীতির দৃশ্যমান পরিবর্তন। দরকার যুদ্ধনীতি থেকে সরে এসে রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটা। দরকার ফিলিস্তিনিদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদাকে স্বীকার করা। দরকার আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা। দরকার এমন এক রাষ্ট্রীয় ভাষা, যেখানে নিরাপত্তার নামে অসামরিক মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক করে দেখা হবে না।
নেতৃত্ব বদল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেতারা রাষ্ট্রের ভাষা, দিকনির্দেশনা ও কূটনৈতিক আচরণ বদলাতে পারেন। কিন্তু নেতৃত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেয়। শুধু নেতানিয়াহুকে সরিয়ে যদি একই সামরিক-রাজনৈতিক কাঠামো চালু থাকে, তাহলে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির সংকট সাময়িকভাবে কমলেও আবার ফিরে আসবে।
ইসরায়েল আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বাইরের বৈশ্বিক চাপ একে অপরকে প্রভাবিত করছে। নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছেন। তারা বলছেন, ইসরায়েলকে আবার সম্মানজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিশ্বকে বোঝানো যে পরিবর্তন শুধু মুখে নয়, নীতিতেও আসবে।
নেতানিয়াহু সরে গেলে পশ্চিমা সরকারগুলোর একটি অংশ হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। তারা হয়তো নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় সাজাতে চাইবে। কিন্তু গাজা, ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরান নিয়ে যদি পুরোনো নীতিই চলতে থাকে, তাহলে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হবে না।
কারণ বিশ্বের মানুষ এখন শুধু নাম দেখছে না, কাজ দেখছে। শুধু নেতা বদল নয়, নীতির পরিবর্তনই ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের আসল পরীক্ষা।
সিভি/এইচএম

