মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতকে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক টানাপোড়েন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে আরও গভীর একটি লড়াই চলছে—একদিকে উন্নয়ন, বাণিজ্য, সংযোগ ও স্থিতিশীলতার মডেল; অন্যদিকে বিপ্লবী ক্ষোভ, সামরিক চাপ, অস্থিতিশীলতা ও ধ্বংসের রাজনীতি। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাই।
শান্তির সময়ে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে অনেক পর্যবেক্ষক ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে দেখেন। বিশাল সম্পদ, প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমনপীড়ন, মেধাপাচার এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আটকে আছে। কিন্তু সংঘাত শুরু হলে এই একই রাষ্ট্র এক ধরনের ভিন্ন সুবিধা পায়। কারণ তার শাসকগোষ্ঠী নিজের জনগণের কষ্টকে রাজনৈতিক মূল্য হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত। প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলো যেখানে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, জনআস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, সেখানে তেহরান অস্থিরতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের গল্প সম্পূর্ণ আলাদা। দেশটি মরুভূমির সীমিত ভূখণ্ড থেকে কয়েক দশকে এমন এক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যেখানে বিমান চলাচল, বন্দর, অর্থনীতি, পর্যটন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক পুঁজি একসঙ্গে জড়ো হয়েছে। দুবাই শুধু একটি শহর নয়; এটি একটি ধারণা—যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বাইরে থেকেও সমৃদ্ধি, আধুনিকতা ও বৈশ্বিক সংযোগের কেন্দ্র হতে পারে। ঠিক এই জায়গাটিই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অস্বস্তির কারণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সম্ভব হলে শাসনব্যবস্থাকেও দুর্বল করবে। কিন্তু প্রায় তিন মাস পর প্রশ্ন বদলে গেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প ইরানকে বদলাতে পারবেন কি না, তা নয়; বরং ইরান কি মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারবে?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে হরমুজ প্রণালী। ওই অঞ্চল দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল, এক-তৃতীয়াংশ সার এবং বিপুল পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম, পেট্রোকেমিক্যাল ও হিলিয়াম সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। এগুলো শুধু জ্বালানি বাজারের বিষয় নয়। এগুলোর সঙ্গে অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, গাড়ি, আলোক-তন্তু তার এবং কৃষি উৎপাদনের মতো বহু খাত জড়িত। তাই হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা দুর্বল হলে তার ধাক্কা শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, বিশ্ব অর্থনীতির বহু স্তরে লাগে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখভাগ হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে তেহরান তার দক্ষিণের প্রতিবেশীকে প্রায় ৩,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন উড়োজাহাজ দিয়ে আঘাত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এসব হামলার ১০ শতাংশেরও কম ছিল আমিরাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে। বিপরীতে ৯০ শতাংশের বেশি হামলার লক্ষ্য ছিল সেই অবকাঠামো, যেগুলো আমিরাতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য, পরিবহন, অর্থনীতি ও পর্যটনের কেন্দ্র বানিয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র, বুর্জ আল আরব হোটেল এবং জেবেল আলি বন্দর—এসব লক্ষ্যবস্তু বেছে নেওয়ার মধ্যেই কৌশলটি স্পষ্ট।
তেহরানের উদ্দেশ্য ছিল শুধু সামরিক ক্ষতি করা নয়, বরং দুবাইয়ের ধারণাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। যে শহর প্রবাসী, বিনিয়োগকারী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের কাছে নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনার প্রতীক, তাকে ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত করা। কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা মেরামত করা কঠিন। বিমানবন্দর বানাতে দশক লাগে, কিন্তু একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতেই আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মন বদলে যেতে পারে। বিনিয়োগ আনতে বছর লাগে, কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখলে পুঁজি রাতারাতি সরে যেতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চায়নি। বরং তারা ট্রাম্পকে হামলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিল। আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। দেশটিতে বিশ্বের বড় ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বসবাস করে; সেখানে ইরানি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ পর্যন্ত বলা হয়। ইরানের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও আমিরাত তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমদানি অংশীদার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার এক প্রয়োজনীয় পথ।
এমনকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে আমিরাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রেখেছেন। তাই আবুধাবির নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, এই পারস্পরিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের ইরানি হামলা থেকে বাঁচাবে। কিন্তু যুদ্ধের সময় দেখা গেল, সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে। আমিরাত প্রায় সব দেশের চেয়ে বেশি হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মানসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের চোখে আমিরাত ছোট, আরব, পশ্চিমঘনিষ্ঠ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা একটি রাষ্ট্র। কিন্তু সেই ছোট রাষ্ট্রই গত কয়েক দশকে এমন সাফল্য দেখিয়েছে, যা ইরানের বিপ্লবী শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করে। প্রতি বছর লাখ লাখ ইরানি আমিরাতে যান, দুবাই দেখেন, তারপর নিজেদের দেশে ফিরে ভাবেন—ইরানও কি এমন হতে পারত না? অনেকেই আর ফিরে যান না।
এই দুই রাষ্ট্রের পার্থক্য নেতৃত্বের দর্শনেও স্পষ্ট। প্রায় পাঁচ দশক আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান মরুভূমির বিভক্ত গোত্রগুলোকে এক রাষ্ট্রে বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, মানুষ কী গড়তে পারে? অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির রাজনৈতিক প্রকল্প দাঁড়িয়েছিল শত্রু, প্রতিশোধ এবং বিপ্লবী আদর্শের ওপর। একজন উন্নয়নকে সামনে রেখেছিলেন, আরেকজন ধ্বংসের ভাষায় রাজনীতি নির্মাণ করেছিলেন।
এই পার্থক্যকে প্রতীকীভাবে বোঝানো যায় দুটি পাখির মাধ্যমে। আমিরাতের জাতীয় প্রতীক বাজপাখি—দৃষ্টি, গতি ও নিখুঁত আঘাতের প্রতীক। দেশটি নিজেকে সেইভাবেই গড়তে চেয়েছে: দ্রুত, উচ্চাভিলাষী, পরিকল্পিত এবং দৃশ্যমান। ইরানের প্রাচীন সংস্কৃতিতে সিমুর্গ ও হোমার মতো পৌরাণিক পাখি জ্ঞান ও সৌভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক আচরণ অনেক সময় শকুনের মতো—অন্যের পতন, ভাঙন এবং সংঘাতের মধ্যে সুযোগ খোঁজা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় পরিকল্পনা ২০৩১ সালের দিকে তাকিয়ে। সেখানে ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, অংশীদারত্ব ও সামাজিক উন্মুক্ততার কথা আছে। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো ১৯৭৯ সালের বিপ্লবী কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। একদিকে ২০৩১ সালের আকাঙ্ক্ষা; অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের ক্ষোভ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারত্ব; অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী শত্রুতার রাজনীতি। একদিকে নিয়ন্ত্রিত হলেও তুলনামূলক সামাজিক উন্মুক্ততা; অন্যদিকে কঠোর দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
ফলাফলও চোখে পড়ার মতো। ১৯৭৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ছিল ইরানের অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আজ আমিরাতের অর্থনীতি ইরানের চেয়ে বড় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যদিও ইরানের ভূখণ্ড প্রায় ২০ গুণ, জনসংখ্যা ৮ গুণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ অনেক বেশি। আমিরাতের পাসপোর্ট বিশ্বে ১ নম্বরে, সিঙ্গাপুরেরও ওপরে। ইরানের পাসপোর্ট ৮৪ নম্বরে, উত্তর কোরিয়ার মাত্র দুই ধাপ ওপরে।
মানবিক সূচকেও ব্যবধান বড়। জাতিসংঘের বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনে গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল ২১তম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ওপরে, এবং আরব বিশ্বে প্রথম। ইরান ছিল ৯৯তম। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে মাথাপিছু মৃত্যুদণ্ডের হার বিশ্বের সর্বোচ্চ এবং জানুয়ারিতে নিজ দেশের হাজারো প্রতিবাদী নাগরিককে দমন করা হয়েছে। দেশটি বছরে আনুমানিক ১,৫০,০০০ শিক্ষিত নাগরিক হারাচ্ছে মেধাপাচারের মাধ্যমে, যার জাতীয় ক্ষতি ১৫০ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে আমিরাত শুধু ২০২৪ সালেই ১,৭৩,০০০ উচ্চদক্ষ কর্মী আকর্ষণ করেছে, যা দক্ষ মানবসম্পদের চতুর্থ জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে তাকে তুলে ধরে।
শান্তির সময়ে তাই আমিরাত এগিয়ে থাকে। কিন্তু সংঘাতের সময়ে ইরানের মতো রাষ্ট্রের সুবিধা তৈরি হয়। কারণ ধ্বংস করা সহজ, গড়া কঠিন। একটি বিমানবন্দর বানাতে বহু বছর লাগে, কিন্তু সেটি অচল করতে একটি আঘাতই যথেষ্ট হতে পারে। বিনিয়োগকারীকে আস্থা দিতে দশক লাগে, কিন্তু ভয় তৈরি করতে কয়েকটি বিস্ফোরণই যথেষ্ট। একটি বৈশ্বিক শহর তৈরি করতে অসংখ্য নীতি, অবকাঠামো ও সামাজিক স্থিতি দরকার, কিন্তু অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে তুলনামূলক কম খরচেই কাজ চলে যায়। ২০,০০০ ডলারের মানববিহীন উড়োজাহাজ যদি বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডর বা ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে থামিয়ে দিতে পারে, তাহলে ধ্বংসের অর্থনীতি নির্মাণের অর্থনীতির চেয়ে ভয়ংকরভাবে সস্তা হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনও এলোমেলো ছিল না। দুবাইয়ের প্রযুক্তি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে ওরাকল ডাটা সেন্টার, আন্তর্জাতিক চলাচল ব্যাহত করতে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বৈশ্বিক পুঁজিকে ভয় দেখাতে দুবাই আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রকে আঘাত করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তেহরান বোঝে, আমিরাতের শক্তি তার সামরিক আয়তনে নয়, তার আস্থার কাঠামোতে। তাই সেই আস্থাকেই লক্ষ্য করা হয়েছে।
এই কৌশলের আরেকটি দিক হলো আঞ্চলিক উদাহরণ ভাঙা। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর কুয়েত, একসময় উপসাগরের ধনী রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম, আগের অবস্থান পুরোপুরি ফিরে পায়নি। ইরানের লক্ষ্য আমিরাতের মতো হওয়া নয়; বরং আমিরাতের মডেলকে দুর্বল করা। কারণ দুবাই টিকে থাকলে সেটি প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, বিপ্লবী স্লোগান ও সামরিকীকরণ ছাড়া অন্য পথও আছে।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থানেও পার্থক্য স্পষ্ট। সংযুক্ত আরব আমিরাত গাজায় ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছে, যা সব আন্তর্জাতিক সহায়তার ৪০ শতাংশের বেশি। ইরান অন্যদিকে হামাসের সামরিক শাখার প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের একটি হিসেবে বছরে আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়ে এসেছে। এক পক্ষ হাসপাতাল ও মানবিক সহায়তায় জোর দেয়, আরেক পক্ষ রকেট, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ করে—এই তুলনাই আঞ্চলিক রাজনীতির চরিত্র বোঝায়।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, যিনি দুই মাস আগে তাঁর পিতার উত্তরসূরি হওয়ার পর এখনো প্রকাশ্যে দেখা বা শোনা যাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ১৯৭৯ সালের ধারাকেই আরও জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রথম ভাষণের ভাষায় শহীদত্ব, প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের মতো শব্দ ছিল; আধুনিকতা ও সমৃদ্ধির ভাষা অনুপস্থিত ছিল। বিপরীতে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে আমিরাতের মূল কৌশল করেছেন। তিনি জানেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা অস্থায়ী, অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী।
দুবাইয়ের আগে বৈশ্বিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বৈরুতের নাম উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু ৩৫ বছরের বেশি আগে শেষ হওয়া ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের ক্ষত আজও শহরটিকে তাড়া করে। আমিরাতের নীতিনির্ধারকেরা তাই জানেন, একটি মাত্র ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রবাসী ও বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পরও এখন পর্যন্ত আমিরাত থেকে বড় ধরনের পুঁজি বা মানবসম্পদ পালানোর লক্ষণ দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এটি আমিরাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানসিক জয়।
তেহরানের আরেকটি হিসাবও ভুল প্রমাণিত হতে পারে। ইরান হয়তো ভেবেছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালিয়ে আবুধাবি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা যাবে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী আমিরাত ইরানের ভেতরে পাল্টা আঘাত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। অর্থাৎ হামলা সম্পর্ক দুর্বল করার বদলে আরও শক্ত করেছে।
তবে আমিরাতকে একমাত্র নৈতিক সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখাও সরলীকরণ হবে। দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সীমাবদ্ধতা আছে, প্রবাসী শ্রমিকদের শোষণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশনীতি নিয়েও সমালোচনা বেড়েছে, বিশেষ করে সুদানে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস এবং ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। প্রক্সি যুদ্ধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের চরিত্রের কেন্দ্রীয় অংশ; একই ধরনের ছায়াযুদ্ধ আমিরাতের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তবু মৌলিক পার্থক্য রয়ে যায়। আমিরাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচারিত হতে চায়, কারণ সে নিজেকে বৈশ্বিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র বরং নিজেকে প্রতিরোধ, শত্রুতা ও বিপ্লবী অবস্থানের মধ্যে আটকে রেখেছে। এক পক্ষ তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভবিষ্যতের বাজারে জায়গা চায়; অন্য পক্ষ অতীতের ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তি বানিয়ে রাখতে চায়।
যুদ্ধের পর ইরানের নিজের সমস্যাও আরও প্রকট হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত্রুতা থেমে গেলে তেহরানকে ৭০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ক্রমাগত দুর্বল মুদ্রা এবং দমনপীড়নে ক্ষতবিক্ষত সমাজের মুখোমুখি হতে হবে। সামরিক সংঘাত শাসকদের সাময়িক ঐক্যের ভাষা দিতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক দুর্দশা ও সামাজিক ক্ষোভকে স্থায়ীভাবে ঢেকে রাখতে পারে না।
অন্যদিকে আমিরাতের দুর্বলতা হলো তার সাফল্যই তার ঝুঁকি। দেশটি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক পুঁজি, বিমান চলাচল, প্রবাসী শ্রম ও বৈশ্বিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। ইরান বড় রাষ্ট্র, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু আমিরাতের মতো রাষ্ট্রকে বাঁচতে হলে স্থিতিশীলতার পরিবেশ দরকার, আর সেই স্থিতিশীলতার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও নিরাপত্তা ছাতা।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের উত্তর কোনো চুক্তির কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান কী স্বাক্ষর করল, ট্রাম্প কী ঘোষণা করলেন, সেটিই সব নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যে কোন দৃষ্টিভঙ্গি জয়ী হবে—অর্থনৈতিক গতিশীলতা, সংযোগ ও ভবিষ্যতমুখী উন্নয়নের পথ, নাকি আদর্শিক ক্ষোভ, সামরিক চাপ ও ধ্বংসের রাজনীতি?
গড়া সবসময় ধীর, কঠিন এবং ব্যয়বহুল। ধ্বংস দ্রুত, সস্তা এবং ভয়াবহ। সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঁচ দশকে যে আস্থা, শহর, বন্দর, বিমানবন্দর ও অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র তা কয়েক দিনের অস্থিরতায় দুর্বল করতে চায়। তাই এই সংঘাত শুধু ইরান ও আমিরাতের নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই—এই অঞ্চলে বাজপাখির উচ্চাভিলাষ টিকবে, নাকি শকুনের ধ্বংসকৌশল জয়ী হবে?
সিভি/এইচএম

