বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার প্রশ্নটি আবারও বড় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে বেশি জটিল। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা জমতে থাকলে তার ফল সাধারণত ভালো হয় না। কখনো হঠাৎ পুঁজি বেরিয়ে যায়, কখনো মুদ্রাবাজার অস্থির হয়ে ওঠে, কখনো বাণিজ্য নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ে, আবার কখনো তা বড় আর্থিক সংকটে রূপ নেয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি।
আজও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বড় চলতি হিসাব ঘাটতিতে আছে, অন্যদিকে চীন আবার উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্তে ফিরে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ব কি আরেকটি অর্থনৈতিক ধাক্কার দিকে এগোচ্ছে? উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই যে, বর্তমান ভারসাম্যহীনতা শুধু আমদানি-রপ্তানির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা, ডলারের আধিপত্য এবং বৈশ্বিক পুঁজির প্রবাহ।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। বর্তমান ভারসাম্যহীনতা ২০০৮ সালের আগের সময়ের মতো বড় নয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাব ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৬ শতাংশে পৌঁছায়, যেখানে ২০০৮ সালের আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তা ছিল ৬ শতাংশ। একইভাবে চীনের উদ্বৃত্ত ছিল ৩.৭ শতাংশ, অথচ সংকটের আগে তা ৯ শতাংশের বেশি ছিল। সংখ্যার দিক থেকে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কম ভয়াবহ হলেও ঝুঁকির ধরন এখন ভিন্ন। কারণ আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মুদ্রা, সরবরাহ শৃঙ্খল ও আর্থিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই ভারসাম্যহীনতা বিশ্বজুড়ে সুরক্ষাবাদী প্রবণতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য ঘাটতিকে কেন্দ্র করে শুল্ক আরোপের রাজনীতি আরও জোরালো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিকে বড় ধরনের শুল্কের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা চীনের শিল্প অতিসক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, অর্ধপরিবাহী ও রোবটিকসের মতো উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীনের দ্রুত বিস্তার উন্নত অর্থনীতির উৎপাদকদের ওপর চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্পোন্নয়নের পথও কঠিন হয়ে উঠছে।
এখানে একটি বড় ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি। অনেকেই মনে করেন, আজকের বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ কেবল বাণিজ্য। কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে গভীর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, জি–৭ এবং ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো দেখাচ্ছে, সমস্যার প্রধান উৎস হলো বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অমিল। অর্থাৎ এক দেশে অতিরিক্ত ব্যয় ও ঋণ, অন্য দেশে অতিরিক্ত সঞ্চয় ও দুর্বল ভোগ—এই দুই বিপরীত প্রবণতা মিলে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতাকে বাড়িয়ে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো রাজস্ব ঘাটতি। দেশটি বড় বাজেট ঘাটতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে বহিরাগত দায় বাড়াচ্ছে। তবু যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিপুল বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম। এর বড় কারণ ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে অবস্থান। বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা এখনো ডলারভিত্তিক সম্পদকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় মনে করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, যা দেশটির শেয়ার ও বন্ড বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কিন্তু এই সুবিধার মধ্যেই ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি বহন করতে পারছে বলে সমস্যা অদৃশ্য হয়ে যায়নি। বরং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের ডলার সম্পদ, শেয়ার ও বন্ডের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত শেয়ারের মতো কিছু নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে তার ধাক্কা দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চীনের অবস্থান উল্টো। সেখানে উৎপাদনক্ষমতা অনেক বেশি, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা তুলনামূলক দুর্বল। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। আবাসন খাতের মন্দা, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে পরিবারের বেশি সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং জনসংখ্যাগত চাপ—সব মিলিয়ে চীনের ভোক্তা চাহিদা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উঠছে না। চীনের শিল্পনীতি এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করেছে বটে, তবে একে একমাত্র কারণ বলা যাবে না।
এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সমস্যা কেবল শিল্প ভর্তুকি বা বাণিজ্য বাধা হতো, তাহলে শুল্ক হয়তো সমাধানের একটি পথ হতে পারত। কিন্তু যখন মূল সমস্যা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কাঠামোগত অমিল, তখন শুল্ক দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণা অনুযায়ী, মুদ্রা বিনিময় হার ও সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন দীর্ঘ মেয়াদে শুল্কের বড় অংশের প্রভাবকে কমিয়ে দেয়।
অর্থাৎ আজকের সংকটের শিকড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য টেবিলে নয়, বরং দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে। যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে হবে এবং আর্থিক খাতের সহনশীলতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে চীনকে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়াতে হবে। এর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, পরিবারের আয় বাড়ানো, মুদ্রার প্রকৃত মূল্য ধীরে ধীরে সমন্বয় করা এবং দ্বিমুখী পুঁজি প্রবাহের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সহায়তা কমিয়ে উচ্চমূল্যের সেবা খাত সম্প্রসারণ করাও চীনের ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন শুধু বিশ্বের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিজেদের স্বার্থেও প্রয়োজন। ঋণনির্ভর ভোগ এবং ক্রমবর্ধমান বহিরাগত দায় কোনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ নয়। একইভাবে শুধু বিদেশি চাহিদার ওপর নির্ভর করাও নিরাপদ কৌশল নয়। একদিকে অতিরিক্ত ঋণ, অন্যদিকে অতিরিক্ত সঞ্চয়—দুটিই শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে।
তবে সমস্যার সমাধান শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কারণ কোনো বড় অর্থনীতির হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে। যদি পুঁজি প্রবাহ আচমকা থেমে যায়, মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় বা ঋণবাজারে চাপ বাড়ে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। তাই ধীরে, দায়িত্বশীলভাবে এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ভারসাম্য ফেরানো জরুরি।
আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক পুঁজির বিশাল ও কেন্দ্রীভূত প্রবাহ থেকে তৈরি আর্থিক ঝুঁকি সামলানো। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও কিছু নির্দিষ্ট সম্পদে আটকে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হচ্ছে এবং সার্বভৌম বন্ড বাজারেও চাপ বাড়ছে। এসব উপাদান একসঙ্গে মিললে একটি বাজারের ধাক্কা দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংক এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বোর্ডের উচিত সীমান্তপারের পুঁজি প্রবাহ, ঋণনির্ভরতা ও তারল্য ঝুঁকি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। একই সঙ্গে সামষ্টিক সতর্কতামূলক নীতি, চাপ পরীক্ষা এবং সংকট প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ১৯৮০-এর দশকের প্লাজা চুক্তির মতো বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা বর্তমান বিভক্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হয়তো সহজ নয়। তবে জি–৭ ও জি–২০ স্বচ্ছতা, সংলাপ ও নীতি-সমন্বয়ের মাধ্যমে এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা বাইরে থেকে বাণিজ্য সমস্যার মতো দেখালেও এর শিকড় অনেক গভীরে। এটি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভ্যন্তরীণ অমিল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কেন্দ্রীভূত পুঁজি প্রবাহের সম্মিলিত ফল। তাই শুধু শুল্ক বাড়িয়ে, আমদানি কমিয়ে বা রপ্তানি বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অভ্যন্তরীণ নীতির সংশোধন, এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্ক ও সমন্বিত পদক্ষেপ।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল নীতি বা বিলম্বিত সিদ্ধান্ত নতুন সংকটের দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু সঠিকভাবে ঝুঁকি বুঝে, ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে এবং বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল সমন্বয় তৈরি করা গেলে সেই সংকট এড়ানো সম্ভব। আজকের প্রশ্ন তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের নয়; এটি পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
সিভি/এইচএম

