ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ কৌশল এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। বাইরে থেকে এটি যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ বলে মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে, নাকি এমন এক বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে যেখানে ইরান আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি অভিপ্রায়পত্র নিয়ে আলোচনা করছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ৩০ দিনের আলোচনা শুরু করা। শুনতে এটি কূটনৈতিক অগ্রগতি মনে হলেও লেখকের বিশ্লেষণে এর আসল বার্তা ভিন্ন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত সংকট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে।
এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের শেষ মানেই সব সময় বিজয় নয়। অনেক সময় যুদ্ধ শেষ করার ভাষা ব্যবহার করা হয় পিছু হটার বাস্তবতাকে আড়াল করতে। ট্রাম্প হয়তো আরেকটি সীমিত সামরিক হামলা চালাতে পারেন, যাতে তাকে দুর্বল দেখায় না এবং যুদ্ধপন্থী সমর্থকদের সন্তুষ্ট রাখা যায়। কিন্তু সেটি যদি বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তের বদলে কেবল প্রতীকী শক্তি প্রদর্শন হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য থাকলেও সামরিক বা ভূরাজনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকবে।
ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতের মোড় ঘুরতে শুরু করে ১৮ মার্চ থেকে। সেদিন ইসরায়েল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। জবাবে ইরান কাতারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন স্থাপনায় আঘাত করে। এরপর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান। সেই মুহূর্ত থেকেই যুদ্ধ কার্যত নতুন অবস্থায় প্রবেশ করে।
তারপর থেকে ট্রাম্প বারবার হামলা শুরুর হুমকি দিলেও, সেগুলো বাস্তব হামলায় রূপ নেয়নি। ইরানের নেতারা গত দুই মাস ধরে ধরে নিয়েছেন যে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার নতুন হামলায় যাবেন না। ফলে ৩৭ দিনের অবিরাম হামলার ক্ষতি সত্ত্বেও তেহরান বড় কোনো ছাড় দেয়নি। বরং ইরানের দাবিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন তারা পরাজিত পক্ষ নয়, বরং সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা পক্ষ। তারা যুদ্ধক্ষতিপূরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কোনো সীমা না থাকা, হরমুজ প্রণালির ওপর স্বীকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞার অবসান চাচ্ছে।
এই অবস্থায় আবার ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার প্রস্তাব ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক পথ হলেও, সমালোচকদের চোখে এটি পরোক্ষভাবে পরাজয় স্বীকারের মতো। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যে পক্ষ চাপ ধরে রাখতে পারে না, আলোচনায় তার দর-কষাকষির ক্ষমতাও কমে যায়। যদি ইরান এই সময়টুকু পুনর্গঠন, অস্ত্র পুনরায় মজুত এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করে, তাহলে ৩০ দিন পর তাকে সামলানো আরও কঠিন হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি এখানে শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময় ইরান এই প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে তেহরানের সঙ্গে পরিবহন চুক্তি করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং যেসব দেশের এমন চুক্তি নেই, তাদের জাহাজ থেকে মাশুল নেওয়া হচ্ছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় ইরানের কৌশলগত অংশীদার রাশিয়া ও চীন অগ্রাধিকার পাবে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো ইরানঘনিষ্ঠ দেশগুলো নিজেদের শর্তে পরিবহন চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারবে। অন্যদিকে যেসব দেশকে ইরান প্রতিপক্ষ মনে করবে, তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইরাকসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে অন্তত অস্থায়ী পরিবহন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সামরিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে না চান, তাহলে জ্বালানিনির্ভর দেশগুলো দ্রুত তেহরানের সঙ্গে বোঝাপড়ায় যেতে চাইবে। কারণ তাদের কাছে রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা বেশি জরুরি হয়ে উঠবে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেসব দেশ এতদিন ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারাও নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইরানের নতুন কেন্দ্রীয় ভূমিকা স্বাভাবিক হয়ে গেলে দেশটির হাতে আরও অর্থ ও প্রভাব জমা হবে।
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন, মার্কিন জনগণ এই কৌশলগত ধাক্কার গভীরতা বুঝে ওঠার আগেই তিনি বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন। যদি হরমুজ দিয়ে তেল আবার চলাচল শুরু করে, বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। শেয়ারবাজার শান্ত থাকলে সাধারণ ভোটারদের চোখে বড় ভূরাজনৈতিক পরাজয়ও তেমন জরুরি মনে নাও হতে পারে। এমনকি ইরান থেকে মনোযোগ সরাতে কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের কথাও সামনে আসতে পারে।
কিন্তু ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ এই যুদ্ধ যদি বর্তমান পথে শেষ হয়, তাহলে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য এটি তার ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা হতে পারে।
কারণ ইরান যদি যুদ্ধের পর আগের চেয়ে শক্তিশালী, ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাবে। বিশ্বের বহু ধনী দেশ তখন ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী হবে, কারণ তাদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ তেহরানের হাতে আটকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েল যদি ইরান বা লেবানন ও গাজায় তার মিত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন সংঘাতে যায়, অনেক দেশ সরাসরি ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি একা হয়ে পড়তে পারে। তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষক যুক্তরাষ্ট্র যদি নীতিগতভাবে দূরে সরে যায়, তাহলে ইসরায়েলের কৌশলগত নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হবে। ট্রাম্পের সমর্থক রাজনৈতিক বলয়ও যদি এই অবস্থানকে মেনে নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী বা ইসরায়েল থেকে দূরত্ব রাখার প্রবণতা আরও শক্ত হতে পারে।
এই সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর ওপর। শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ইরান তাদের নতুন অর্থ, সাহস ও রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে। একই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলো যদি নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য হয়, তাহলে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কাঠামো আগের মতো থাকবে না।
ট্রাম্প দাবি করতে পারেন, নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত তার কথাই মানবেন। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কি চুপচাপ দেখবে যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা ধীরে ধীরে ইরান নিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে অনিশ্চিত। আর এই অনিশ্চয়তাই পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে।
সব মিলিয়ে এই বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার ভাষা ব্যবহার করলেই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায় না। কখনো কখনো আলোচনার টেবিলই বলে দেয়, মাঠে কে চাপ ধরে রাখতে পেরেছে আর কে পিছু হটেছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালি ও ইরানের প্রভাব রুখতে না চান, তাহলে পারস্য উপসাগরে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর একক নিয়ন্ত্রক নয়, আর ইরান কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ দরজার প্রহরী।
এই নতুন বাস্তবতায় বাজার হয়তো সাময়িক স্বস্তি পাবে, তেল চলাচল আবার শুরু হতে পারে, দেশগুলো দ্রুত চুক্তি করতে পারে। কিন্তু এর বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, জাহাজ চলাচলে বারবার বাধা এবং মিত্রতার নতুন হিসাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, একবার কোনো প্রভাবশালী শক্তি নিজের আধিপত্য ছেড়ে দিলে সেই শূন্যস্থান খালি থাকে না। অন্য কেউ সেটি পূরণ করে। এই সংকটে সেই ভূমিকায় ইরানই এগিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

