যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সেই হিসাবকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো অচল করে দেওয়া, লঞ্চার ব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, তেহরান ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আবারও সেই ঘাঁটিগুলোর বড় অংশ চালু করার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
ইরান শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির প্রবেশপথ পরিষ্কার করছে না, বরং ড্রোন উৎপাদন ও লঞ্চার সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, সংঘাত যদি আবার শুরু হয়, তাহলে ইরান যে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে—এই ধারণা এখন আর কেবল অনুমান নয়, বরং স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও সামরিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দৃশ্যমান বাস্তবতা।
এই পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে যে ক্ষতি করা হয়েছে, তা মেরামতে ইরান ব্যবহার করছে তুলনামূলক সাধারণ যন্ত্রপাতি—বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক ও খননযন্ত্র। অর্থাৎ একদিকে কোটি কোটি ডলারের আধুনিক বোমা, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য প্রচলিত নির্মাণযন্ত্র। এই বৈপরীত্যই বর্তমান সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
হামলার লক্ষ্য ছিল ঘাঁটি অচল করা, ধ্বংস নয়
ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পাহাড়ের গভীরে এবং মাটির নিচে নির্মিত। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব স্থাপনা তৈরি করেছে তেহরান। কিছু ঘাঁটি কয়েকশ মিটার পাথরের নিচে অবস্থিত, ফলে সেগুলো সরাসরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল টানেলের মুখ, প্রবেশপথ ও সংযোগ সড়ক। সামরিক হিসাব ছিল, টানেলের মুখ বন্ধ করে দিলে ভেতরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা কঠিন হবে।
যুদ্ধের শুরুতে এই কৌশল কিছুটা কার্যকর বলেই মনে হয়েছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হার কমে আসে এবং অনেক ঘাঁটির প্রবেশপথে বড় গর্ত তৈরি হয়। কিন্তু এই সাফল্য ছিল অনেকাংশে সাময়িক। কারণ টানেলের ভেতরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র বা অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না হলে প্রবেশপথ মেরামত করলেই ঘাঁটিগুলো আবার ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে। দেজফুল, কেরমানশাহ, ইসফাহান ও খোমেইন এলাকার বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ধ্বংসস্তূপ সরানো, গর্ত ভরাট, রাস্তা মেরামত এবং টানেলের মুখ পুনরায় খোলার লক্ষণ দেখা গেছে। দেজফুলে একটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির পাঁচটি প্রবেশপথের মধ্যে চারটি ১২ মে পুনরায় খোলা হয়েছে বলে ছবিতে দেখা যায়। কেরমানশাহের উত্তরের ঘাঁটিতেও ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখের ছবিতে বোমা হামলার বড় ক্ষত দেখা গেলেও ৮ মে ২০২৬ সালের ছবিতে সেই ক্ষত অনেকটাই মেরামত করা অবস্থায় দেখা গেছে।
১৮টি ঘাঁটি, ৬৯টি টানেল মুখ, আর দ্রুত পুনরুদ্ধার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের অন্তত ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ৬৯টি টানেল মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংখ্যাটি ছোট নয়। এটি দেখায় যে হামলা ছিল বিস্তৃত এবং পরিকল্পিত। তবে একইসঙ্গে আরেকটি সংখ্যাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ইরান ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টি টানেলের মুখ পুনরায় সচল করেছে।
এই পরিসংখ্যান সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি বোঝায়, শুধু প্রবেশপথে হামলা চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে অচল রাখা কঠিন। টানেলের মুখ ধ্বংস করা যায়, কিন্তু পাহাড়ের গভীরে থাকা মজুত, লঞ্চার বা অন্যান্য সামরিক উপকরণ অক্ষত থাকলে সেগুলো আবার ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব।
ইসফাহানের কাছে একটি ঘাঁটিতে একাধিক টানেলের মুখ বন্ধ করতে বড় ধরনের বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের শুরুতেই সেখানে ডাম্প ট্রাক দিয়ে গর্ত ভরাট এবং দুটি সড়ক মেরামতের কাজ শুরু করে ইরান। খোমেইন এলাকার আরেক ঘাঁটিতে একসঙ্গে অন্তত ১০টি ডাম্প ট্রাককে পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত দেখা গেছে। এই দৃশ্য কেবল মেরামতের ছবি নয়; এটি ইরানের সামরিক প্রস্তুতি, সংগঠিত পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ-ভাবনারও ইঙ্গিত দেয়।
বুলডোজার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে
এই ঘটনায় বুলডোজার একটি সাধারণ নির্মাণযন্ত্রের চেয়েও বেশি অর্থ বহন করছে। সামরিক দৃষ্টিতে এটি দেখাচ্ছে, শত্রুর ব্যয়বহুল হামলার পরও তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুতগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির গবেষক তিমুর কাদিশেভের বিশ্লেষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ক্ষতি করতে অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের প্রয়োজন হলেও সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় সাধারণ যন্ত্রপাতিই যথেষ্ট হয়ে যায়।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে। যদি হামলার লক্ষ্য হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি স্থায়ীভাবে দুর্বল করা, তাহলে শুধু টানেলের মুখে হামলা কতটা কার্যকর? আর যদি লক্ষ্য হয় সাময়িকভাবে হামলার গতি কমানো, তাহলে সেটি সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে এখন দ্বিতীয় বাস্তবতাই বেশি স্পষ্ট।
ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ
ইরান বহু বছর ধরেই জানত, তার সামরিক স্থাপনা আকাশপথের হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনায় তেহরান ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামোকে নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলে। পাহাড়ের গভীরে তৈরি এসব ঘাঁটিকে অনেক সময় ক্ষেপণাস্ত্র শহর হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।
এই ঘাঁটিগুলোর উদ্দেশ্য শুধু অস্ত্র সংরক্ষণ নয়। এগুলোর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখা, লঞ্চার প্রস্তুত রাখা, হামলার আগে দ্রুত সরঞ্জাম বের করা এবং হামলার পর আবার গভীরে লুকিয়ে ফেলা সম্ভব। ফলে এগুলোকে ধ্বংস করতে হলে শুধু প্রবেশপথে নয়, ভেতরের অবকাঠামোতেও সরাসরি আঘাত করতে হয়। কিন্তু কয়েকশ মিটার পাথরের নিচে থাকা স্থাপনাকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন মাটির নিচে থাকা প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যদি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহারের মতো অবস্থায় থাকে এবং লঞ্চার ব্যবস্থাও পুনরুদ্ধার করা যায়, তাহলে ইরান আবার বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হতে পারে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো
মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করাকে যুদ্ধের প্রধান পাঁচটি লক্ষ্যের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এই ঘোষণার রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব ছিল বড়। কারণ এটি শুধু একটি হামলার লক্ষ্য নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু এখনকার চিত্র বলছে, সেই লক্ষ্য পূরণ করা সহজ হয়নি। হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সাময়িকভাবে কমেছে, উৎপাদন অবকাঠামোর ওপরও আঘাত এসেছে—তবু ইরানের সামগ্রিক সক্ষমতা শেষ হয়ে যায়নি। বরং দেশটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দেখাচ্ছে যে তার সামরিক ব্যবস্থার বড় অংশই ধাপে ধাপে আবার সক্রিয় করা সম্ভব।
এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত অস্বস্তির বিষয়। কারণ আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিপক্ষের স্থায়ী সক্ষমতা ধ্বংস করা। শুধু দৃশ্যমান স্থাপনা ধ্বংস করলেই যদি প্রতিপক্ষ আবার দ্রুত ফিরে আসে, তাহলে হামলার সামরিক ফল সীমিত হয়ে যায়।
যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়েছে তেহরান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে টানেলের মুখ খোলা ও ধ্বংসস্তূপ সরানো ইরানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ সেই সময় খননযন্ত্র ও মেরামতকারী দলও হামলার লক্ষ্য হতে পারত। তবুও তারা কাজ বন্ধ করেনি। এরপর সাত সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধবিরতির সময় পুনর্গঠনের কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নেয় তেহরান।
এই জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিরতি সাধারণত কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু একইসঙ্গে এটি সামরিক পুনর্গঠনেরও সুযোগ হতে পারে। ইরান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ধ্বংসস্তূপ সরানো, রাস্তা মেরামত, গর্ত ভরাট এবং প্রবেশপথ পুনরায় চালু করার কাজ যুদ্ধবিরতির সময় দ্রুততর হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধবিরতি কি স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করছে, নাকি পরবর্তী সংঘাতের আগে উভয় পক্ষকে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিচ্ছে? ইরানের দ্রুত পুনর্গঠন এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
ড্রোন উৎপাদন ও লঞ্চার সক্ষমতা ফিরে আসা
ইরানের সামরিক শক্তির আরেকটি বড় অংশ হলো ড্রোন। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে। একইসঙ্গে লঞ্চার উৎপাদন সক্ষমতাও ফিরিয়ে এনেছে। এই দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ইরান শুধু পুরোনো ক্ষতি মেরামত করছে না; বরং হামলার সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে।
ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হামলা চালানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন লঞ্চার, প্রশিক্ষিত জনবল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা এবং নিরাপদ ঘাঁটি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে যদি লঞ্চার ও প্রশিক্ষিত ক্রু থাকে, তাহলে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা কঠিন নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণা সংস্থা জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ারের মূল্যায়নও এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে।
অর্থাৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও মজুত ক্ষেপণাস্ত্র এবং কার্যকর লঞ্চার থাকলে ইরানের হামলার ক্ষমতা বজায় থাকতে পারে। এই কারণেই ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে। এই সময়টিই সবচেয়ে সংবেদনশীল। কারণ আলোচনার টেবিলে অগ্রগতি না হলে কিংবা নতুন কোনো হামলা হলে সংঘাত আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেখানে উত্তেজনা তৈরি হলে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য রুট এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। তাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পুনরায় সচল হওয়ার খবর শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সংঘাত আবার শুরু হলে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবে। লক্ষ্য হতে পারে ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি অথবা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। যদিও এসব সম্ভাবনা এখনো বিশ্লেষণের পর্যায়ে, তবু ইরানের পুনর্গঠন যে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
বড় শিক্ষা: আধুনিক বোমা সব সমস্যার সমাধান নয়
এই ঘটনা থেকে একটি বড় সামরিক শিক্ষা পাওয়া যায়—আধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্র সব সময় স্থায়ী ফল দেয় না। প্রতিপক্ষ যদি আগে থেকেই গভীর ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো, বিকল্প রাস্তা, মেরামত সক্ষমতা এবং দ্রুত পুনর্গঠন ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে, তাহলে হামলার ফল দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।
ইরান সম্ভবত এই ধরনের যুদ্ধের জন্য বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। পাহাড়ের নিচে ঘাঁটি, ছড়িয়ে থাকা টানেল নেটওয়ার্ক, মজুত ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুত মেরামতকারী দল এবং সাধারণ নির্মাণযন্ত্রের ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের প্রতিরোধ কৌশল। এর লক্ষ্য হলো আঘাত সহ্য করা এবং দ্রুত আবার কার্যক্ষম হওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এটি একটি কঠিন বাস্তবতা। তারা সাময়িকভাবে ইরানের হামলার গতি কমাতে সক্ষম হলেও, স্থায়ীভাবে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারেনি বলেই এখন মনে হচ্ছে। আর এই ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যতের সামরিক পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পুনরায় সচল করার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৮টি ঘাঁটির ৬৯টি টানেল মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও অন্তত ৫০টি টানেল মুখ পুনরায় চালু করা তেহরানের পুনর্গঠন সক্ষমতার স্পষ্ট প্রমাণ। দেজফুল, কেরমানশাহ, ইসফাহান ও খোমেইন এলাকার স্যাটেলাইট চিত্র দেখাচ্ছে, ইরান ধ্বংসস্তূপের নিচে থেমে নেই; বরং দ্রুত নিজেদের সামরিক শক্তি ফিরিয়ে আনছে।
বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক ও খননযন্ত্র দিয়ে যে পুনরুদ্ধার চলছে, তা শুধু অবকাঠামো মেরামত নয়—এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তাও। বার্তাটি হলো, ব্যয়বহুল বিমান হামলা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ করে দিতে পারেনি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কূটনৈতিক সমঝোতা কি এই উত্তেজনা থামাতে পারবে, নাকি পুনর্গঠিত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো আবারও নতুন সংঘাতের মঞ্চ হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির বাস্তবতায় এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের জন্য নয়; পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

