যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি ভোট হয়েছে, যা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরাননীতি ও যুদ্ধক্ষমতার ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। বুধবার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা এমন একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধে কংগ্রেসের ক্ষমতা প্রয়োগ করা। ভোটের ফল ছিল ২১৫ পক্ষে এবং ২০৮ বিপক্ষে। সংখ্যার হিসাবে ব্যবধান খুব বড় নয়, কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে চারজন রিপাবলিকান সদস্যও ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিয়েছেন।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে বেসামরিক প্রাণহানি, আঞ্চলিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। শুরুতে রিপাবলিকানদের বড় অংশ প্রকাশ্যে ট্রাম্পের পাশে থাকলেও সময় যত এগিয়েছে, দলটির ভেতরেও অস্বস্তি স্পষ্ট হয়েছে। বুধবারের ভোট সেই অস্বস্তিরই প্রকাশ।
তবে এই ভোটের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প এখনই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালাতে পারবেন না। বাস্তবতা হলো, প্রতিনিধি পরিষদের এই সিদ্ধান্ত এখনো অনেক দূরের পথের শুরু মাত্র। সিনেটেও একই ধরনের প্রস্তাব পাস হতে হবে। এরপরও প্রেসিডেন্ট চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক ভারসাম্যে সেটি খুব কঠিন।
এই কারণে বুধবারের ভোটকে একদিকে কংগ্রেসের বিরল রাজনৈতিক প্রতিবাদ বলা যায়, অন্যদিকে এটি এখনো কার্যকর বাধা নয়। এটি ট্রাম্পকে আইনগতভাবে আটকে দেয়নি, তবে তাকে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষমতা আইন। ১৯৭৩ সাল থেকে কার্যকর এই আইন অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে সশস্ত্র সংঘাতে যুক্ত হন, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে সামরিক অভিযান শেষ করতে হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন হামলার আশঙ্কা থাকলে প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সেনা মোতায়েন করতে পারেন। এমন অবস্থাতেও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানানো বাধ্যতামূলক।
আইন অনুযায়ী, কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে প্রেসিডেন্টকে ৬০ দিনের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়। ইরানসংঘাতের ক্ষেত্রে সমালোচকদের অভিযোগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো আসন্ন হামলার মুখে ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম হামলা চালায়। তাই কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানো সংবিধান ও যুদ্ধক্ষমতা আইনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি হলো, যুদ্ধ ঘোষণা করার অধিকার প্রেসিডেন্টের নয়, কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও বিদেশে যুদ্ধ শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। এই যুক্তিতেই তারা বারবার যুদ্ধক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ইরানযুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আগের তিনটি চেষ্টা সফল হয়নি। বুধবারের ভোট সেই ধারাবাহিকতায় প্রথম বড় সাফল্য।
ভোটে চারজন রিপাবলিকান সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। টম ব্যারেট, ওয়ারেন ডেভিডসন ও থমাস ম্যাসি দুই সপ্তাহ আগের ভোটেই দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়েছিলেন। বুধবার তাদের সঙ্গে ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিকও যোগ দেন। এটি ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত। কারণ রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকে যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধিতা সাধারণত খুব সহজে দেখা যায় না।
এই বদলের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, যুদ্ধ দীর্ঘ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দ্রুত কোনো স্থায়ী সমঝোতা আসেনি। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে। চতুর্থত, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে। ফলে রিপাবলিকানদের একটি অংশ বুঝতে পারছে, ইরানযুদ্ধ শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়, এটি এখন ঘরোয়া রাজনীতির ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন করদাতাদের অর্থ একটি বেপরোয়া যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করছে। তার ভাষায়, এটি এমন এক যুদ্ধ, যা বেছে নেওয়া হয়েছে, বাধ্য হয়ে করা হয়নি। এই বক্তব্য ডেমোক্র্যাটদের মূল অবস্থানকে তুলে ধরে। তাদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আত্মরক্ষামূলক বাধ্যবাধকতা নয়।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। তাদের দাবি, ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে কংগ্রেসের আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। প্রশাসনের যুক্তি হলো, প্রেসিডেন্ট জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। আরও বড় যুক্তি হিসেবে তারা বলছে, ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। তাই প্রশাসনের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সক্রিয় যুদ্ধে নেই।
এই যুক্তি নিয়েই বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে। ১ মে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির অর্থ হলো সংঘাতের অবসান। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবতা এত সরল নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইরানি জাহাজেও হামলা হয়েছে। অন্যদিকে তেহরানও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে। ফলে কাগজে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে সংঘাতের উপাদান রয়ে গেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার ও বুধবার আইনপ্রণেতাদের সামনে শুনানিতে বলেন, ইরানযুদ্ধ শেষ। কিন্তু এই বক্তব্য ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সিনেটর কোরি বুকারের সঙ্গে তার তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। সিনেটর জিন শাহিন অভিযোগ করেন, প্রশাসন কংগ্রেসকে যথাযথ তথ্য দেয়নি। তার বক্তব্যে উঠে আসে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে কংগ্রেসকে জানানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় শত্রুতায় নেই। তার মতে, এটি পরামর্শ নয়, বরং জবাবদিহি এড়ানোর চেষ্টা।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করতে পারে? ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ১২ মে সিনেটের বরাদ্দ কমিটির শুনানিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট চাইলে আবার ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা তার হাতে রয়েছে। তার যুক্তি হলো, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি আগের সময়সীমা নতুনভাবে শুরু করেছে। অর্থাৎ প্রশাসনের ব্যাখ্যায়, যুদ্ধবিরতির পর আবার অভিযান শুরু করলে ৬০ দিনের সময়সীমা নতুন করে গণনা করা যেতে পারে।
এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ সমালোচকদের মতে, এমন ব্যাখ্যা মেনে নিলে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বারবার সময়সীমা নতুন করে শুরু করতে পারেন। তাহলে যুদ্ধক্ষমতা আইনের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে যাবে। আইনটি তৈরি হয়েছিল প্রেসিডেন্টের একতরফা যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার জন্য। কিন্তু প্রশাসনের ব্যাখ্যা সেই সীমাকে প্রায় অকার্যকর করে দিতে পারে।
সিনেটের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দুই সপ্তাহ আগে সিনেটে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার একটি ভোট হয়েছিল। সেখানে ফল ছিল ৫০-৪৭। ১০০ সদস্যের সিনেটে চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন। তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেন। ফলাফলে রিপাবলিকানদের ভেতরে অসন্তোষের ইঙ্গিত থাকলেও প্রস্তাব পাসের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
এখানেই বোঝা যায়, প্রতিনিধি পরিষদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা এখনো যথেষ্ট নয়। ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, কিন্তু আইনগত বাধা তৈরি হয়নি। কংগ্রেসের দুই কক্ষকে একই অবস্থানে আসতে হবে। এরপরও প্রেসিডেন্টের প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে ট্রাম্প চাইলে নতুন হামলার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, এমন বলা যাবে না।
তবুও বুধবারের ভোটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, ইরানযুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐকমত্য ভাঙছে। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান দলের ভেতরে যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা বাড়ছে। তৃতীয়ত, কংগ্রেস আবারও নিজের সাংবিধানিক যুদ্ধক্ষমতা সামনে আনতে চাইছে।
এই ভোটের আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো, এটি যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্যকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হাজারো বেসামরিক মৃত্যুর অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা, বাণিজ্যপথে অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থব্যয়—সব মিলিয়ে ইরানযুদ্ধ এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, নৈতিকতা, অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নও।
ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে দাবি করলেও বাস্তবতা বলছে, পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর। শান্তি আলোচনা চলছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ চালাচ্ছে, ইরানও পাল্টা চাপ বজায় রেখেছে। এই অবস্থায় নতুন সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের ভোট ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সরাসরি থামায়নি, কিন্তু তার রাজনৈতিক পথ কঠিন করেছে। এটি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। বার্তাটি হলো, প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে গেলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া সহজ হবে না।
ইরানযুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর। সিনেট কী করে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির ব্যাখ্যা কীভাবে ব্যবহার করে, এবং রিপাবলিকান দলের ভেতরের অসন্তোষ কত দূর যায়। আপাতত ভোটটি প্রতীকী হলেও এর রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি বড়। কারণ কখনো কখনো প্রতীকী ভোটই ভবিষ্যতের বড় ক্ষমতার লড়াইয়ের শুরু হয়ে দাঁড়ায়।

