মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি সব সময়ই প্রকাশ্য যুদ্ধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, জোট-প্রতিজোট এবং গোপন নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডের জটিল সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে গোপন সামরিক ও গোয়েন্দা আস্তানা তৈরি করেছে এবং সেগুলো ব্যবহার করে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, উদ্ধার অভিযান, রসদ সরবরাহ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের মতো কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকের নাজাফ মরুভূমির একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি থেকে শুরু করে আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার সোমালিল্যান্ড পর্যন্ত ইসরায়েলের গোপন উপস্থিতির দাবি উঠেছে। এসব দাবি এখনো অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্র, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্য মিলিয়ে একটি বড় ছবির ইঙ্গিত পাওয়া যায়—ইরানের চারপাশে এক ধরনের অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, যার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের আগে কৌশলগত সুবিধা অর্জন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১১ ঘণ্টা আগে প্রকাশিত এবং ১১ ঘণ্টা আগে সর্বশেষ হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের জনমানবশূন্য নাজাফ মরুভূমিতে সাদ্দাম হোসেন আমলের একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বাহিনী গোপনে অবস্থান নিয়েছিল। প্রথমে একজন ইরাকি মেষপালকের চোখে ওই আস্তানার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে দাবি করা হয়। পরে অনুসন্ধানী সূত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
তবে নাজাফের ওই আস্তানা ঘটনাটির শুধু একটি অংশ। বড় প্রশ্ন হলো, ইরানের আশপাশে আর কোথায় কোথায় এমন গোপন উপস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং সেগুলোর উদ্দেশ্য কী ছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে একাধিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইরাক ছাড়াও আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের গোপন সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিল। এই দাবিগুলো সত্য হলে তা শুধু ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করে।
গোপন ঘাঁটির মূল সুবিধা ছিল ভৌগোলিক অবস্থান। ইসরায়েলের নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে ইরানের গভীরে নজরদারি বা অভিযান পরিচালনা করা সহজ নয়। তেহরান থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করেও ইরানের ভেতরে ধারাবাহিক সামরিক চাপ সৃষ্টি করা কীভাবে সম্ভব হয়েছে—এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে গেলে এসব গোপন আস্তানার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ইসরায়েল সামরিক গতিবিধি, পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সংকেত সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।
প্রাথমিকভাবে এসব ঘাঁটির উদ্দেশ্য ছিল জরুরি পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের পাইলট উদ্ধার, রসদ সহায়তা এবং নিরাপদ যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আস্তানার কাজের পরিধি বাড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। উদ্ধার সহায়তার আড়ালে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আড়িপাতার যন্ত্র বসানো, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, বিশেষ বাহিনীর অস্থায়ী অবস্থান এবং ড্রোন পরিচালনার মতো কার্যক্রম যুক্ত হয়। ফলে এগুলো কেবল সামরিক সহায়ক কেন্দ্র নয়, বরং আঞ্চলিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার অংশে পরিণত হয়।
আজারবাইজানের ভূমিকা এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। সিএনএন চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের এলিট সামরিক ও গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল। ইরান সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় তারা অবস্থান নেয় এবং উত্তর ইরানের ভেতরে নজরদারি চালানো তাদের প্রধান কাজের একটি ছিল। একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে ইসরায়েলের বিশেষ অভিযান বাহিনী, হেলিকপ্টারভিত্তিক উদ্ধারকারী দল এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কয়েক ডজন সদস্য অংশ নেয়।
আরেকটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দলে বিশেষ কমান্ডো ইউনিটও ছিল, যারা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ড্রোন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি ঘাঁটির অবস্থান ছিল ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের সময় তাবরিজ শহরে বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েল। এই তথ্যগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, আজারবাইজানের ভৌগোলিক অবস্থান ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছিল।
গোপন ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি নিয়েও প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেই ইসরায়েল সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রস্তুতি শুরু করে। দুটি সূত্রের তথ্যমতে, জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইরানে যখন ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, তখনই আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে আড়িপাতার যন্ত্র এবং আধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। পরিকল্পনা ছিল, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ইরানে বিমান হামলা শুরু হলে সেই আড়ালে সীমান্তে ঘাঁটি গড়ে তোলা হবে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে ওই সময়ে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও ইসরায়েল একা গোপন ঘাঁটির পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়। কারণ, তাদের ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকাশ্য কূটনীতির পাশাপাশি আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি চলছিল এবং ইসরায়েল সম্ভাব্য সংঘর্ষকে সামনে রেখে নিজস্ব গোয়েন্দা সুবিধা তৈরি করছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাডার ফাঁকি দিতে পারে এমন যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করে সীমান্তবর্তী এলাকায় আড়িপাতার যন্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম বসানো হয়। এমন পদক্ষেপ সাধারণ সামরিক প্রস্তুতির চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তের কাছাকাছি এমন কার্যক্রম কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। তবু ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলে ইরানকে কেন্দ্রীয় হুমকি হিসেবে দেখা হয় বলেই এই ধরনের উচ্চঝুঁকির অভিযান নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়।
আজারবাইজান থেকে চালানো সবচেয়ে বড় অভিযানের একটি হিসেবে ৪ মার্চের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই দিন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রহমান মোঘাদ্দামকে হত্যা করা হয়। ইসরায়েলের দাবি, ২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মোঘাদ্দাম। এই দাবি অত্যন্ত গুরুতর, কারণ এটি শুধু ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রকেও এই সংঘাতের বিস্তৃত নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে যুক্ত করে।
৪ মার্চের ঘটনার দুদিন পর, ৬ মার্চ আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা জানায় যে তারা আইআরজিসির একটি চক্রান্ত নস্যাৎ করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান আজারবাইজানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ইসরায়েলে হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পর ইসরায়েল প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে এটি ছিল মোসাদ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং আজারবাইজানের নিরাপত্তা সংস্থার একটি যৌথ অভিযান। তবে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আজারবাইজানের দূতাবাসের এক মুখপাত্র তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই দ্বৈত অবস্থানই দেখায়, গোপন নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকলেও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করা রাজনৈতিকভাবে কতটা সংবেদনশীল।
সোমালিল্যান্ডের প্রসঙ্গও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সিএনএনের একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দরনগরীতে ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি ছিল। দূরপাল্লার অভিযানে যাওয়া ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সেখান থেকে জ্বালানি নিত বা যাত্রাবিরতির জন্য জায়গাটি ব্যবহার করত বলে দাবি করা হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে বেরবেরা লোহিত সাগর, আরব উপদ্বীপ এবং পূর্ব আফ্রিকার সংযোগস্থলের কাছাকাছি। ফলে এই অবস্থান সামরিক ও গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত মূল্যবান।
গত ডিসেম্বরে ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বীকৃতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কৌশলগত অবস্থান—এই তিনটি বিষয় একত্রে বিবেচনা করলে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে কেবল কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি আফ্রিকার শিং অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানো এবং দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা জোরদারের অংশ হতে পারে। তবে সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রেও গোপন নিরাপত্তা সহযোগিতার দাবি উঠেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাতে সিএনএন জানায়, ইসরায়েল গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম এবং তা পরিচালনার জন্য সেনা পাঠিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান এবং ইসরায়েলি সেনাপ্রধান গোপনে আমিরাত সফর করেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে আমিরাত সরকার এই সফরের খবর জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
আমিরাতের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের মধ্যে প্রকাশ্য সম্পর্কের নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্কের আড়ালে কতটা নিরাপত্তা সহযোগিতা চলছে, সেটি সব সময় স্পষ্ট নয়। ইরানবিরোধী নিরাপত্তা উদ্বেগ অনেক উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের নীরব স্বার্থের মিল তৈরি করেছে। তবে এসব সহযোগিতা প্রকাশ্যে এলে অভ্যন্তরীণ জনমত, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইরাকের ভেতরে দুটি গোপন ঘাঁটির কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং নিউইয়র্ক টাইমস ১০ মে প্রথম ইরাকের ওই দুটি ঘাঁটির বিষয় প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাক সরকারের অনুমতি ছাড়াই ইসরায়েলি বাহিনী দেশটির ভেতরে গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছিল। এগুলো মূলত রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত হতো। যদি এই দাবি সঠিক হয়, তাহলে এটি ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে আনে এবং একইসঙ্গে দেখায়, আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় দুর্বল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কীভাবে বড় শক্তিগুলো ব্যবহার করতে পারে।
তবে এই পুরো ঘটনার পেছনে শুধু সামরিক হিসাব নেই; আছে কূটনীতি, অর্থনীতি এবং লবিংয়ের জটিল সম্পর্কও। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহু দেশের কাছে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে ওয়াশিংটনে প্রভাব বিস্তার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো, নিরাপত্তা সহায়তা পাওয়া বা চুক্তিতে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন ধারণা অনেক দেশের নীতিতে কাজ করে।
আজারবাইজানের ক্ষেত্রে এই হিসাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক জোশুয়া কুচেরার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আজারবাইজান কূটনৈতিক সুবিধা পায়। ওয়াশিংটনে থাকা ইসরায়েলি লবিকে বাকু নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। একইসঙ্গে আজারবাইজান নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর ইসরায়েল বাকুকে আরব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের একটি কার্যকর সেতু হিসেবে দেখতে পারে।
অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। আজারবাইজান ইসরায়েলকে তার প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে ইসরায়েল আজারবাইজানের কাছে উন্নত অস্ত্র বিক্রি করে। এসব অস্ত্র ২০১৬ ও ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল বাকু। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়; এটি জ্বালানি, অস্ত্র, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বহুমাত্রিক সম্পর্ক।
ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বেগিন সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গারসন কোগানের মতে, আজারবাইজানে ইসরায়েলের কৌশল ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়। এই সম্পর্ক মূলত অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে যতটা দেখা যায়, সম্পর্কের বাস্তব গভীরতা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু দুই রাষ্ট্রের সামরিক দ্বন্দ্ব নয়। এটি এমন এক ছায়াযুদ্ধ, যেখানে প্রতিবেশী দেশ, দূরবর্তী ভূখণ্ড, গোপন ঘাঁটি, আড়িপাতার প্রযুক্তি, কূটনৈতিক লবিং, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক বাণিজ্য একসঙ্গে কাজ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকার জানত, আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনের অজান্তেও কার্যক্রম চলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের গোপন সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। ইরান যদি মনে করে তার প্রতিবেশী দেশগুলো ইসরায়েলের সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে শুধু ইসরায়েল নয়, ওই দেশগুলোর সঙ্গেও ইরানের উত্তেজনা বাড়তে পারে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি রুট, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘাঁটিগুলো ছিল আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার কৌশলগত হাতিয়ার। ইরানকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা উদ্বেগ ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতিতে প্রভাব ফেলেছে, তা এই ধরনের গোপন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে নিরাপত্তার নামে অন্য দেশের ভূখণ্ডে গোপন সামরিক কার্যক্রম চালানো আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও উত্থাপন করে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা তাই শুধু প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি বড় অংশ চলছে অদৃশ্য পরিসরে—গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্তের কাছাকাছি সরঞ্জাম স্থাপন, গোপন যাত্রাবিরতি কেন্দ্র, সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় এবং কূটনৈতিক অস্বীকারের ভেতর দিয়ে। এই ছায়াযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, কোনো একটি গোপন অভিযান ব্যর্থ হলে বা প্রকাশ্যে চলে এলে তা দ্রুত বড় আকারের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, এসব প্রতিবেদন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতির একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব এখন আর শুধু সরাসরি হামলা বা পাল্টা হামলার বিষয় নয়; এটি গোটা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। আজারবাইজান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সোমালিল্যান্ডের মতো জায়গাগুলোর নাম সামনে আসা প্রমাণ করে, আধুনিক সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনেক সময় প্রকাশ্যে দেখা যায় না। দৃশ্যমান যুদ্ধের পেছনে থাকে অদৃশ্য ঘাঁটি, নীরব মিত্রতা এবং বহুস্তরীয় কৌশল—যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর পড়ে।

