ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর ১০০ দিন পূর্ণ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখনো কমেনি। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার পথ খুলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিরতি থাকলেও শান্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি আবারও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধ এড়াতে চাইছে বলে মনে হলেও মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। একদিকে সংঘর্ষ, পাল্টা হামলা ও সামরিক সতর্কতা চলছে; অন্যদিকে পর্দার আড়ালে শান্তি আলোচনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আলোচনার টেবিলে যে অগ্রগতি দরকার, সেটি এখনো দৃশ্যমান নয়।
রোববার, ৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই সেখানে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া—দুটিই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর আগে ইরানের উপকূলীয় স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাবে তেহরান বাহরাইন ও কুয়েতে হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি হামলা প্রমাণ করে, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সংঘাত পুরোপুরি থামাতে পারেনি। বরং যুদ্ধবিরতি এখন অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে—যেখানে সামান্য ভুল হিসাবও বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এই চুক্তির লক্ষ্য হতে পারে সরাসরি যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সামরিক উত্তেজনা কমানো। তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি হবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আলোচনায় এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয় ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে যুদ্ধ থামানো, পরে বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা—এমন একটি পথ খোঁজা হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে রয়েছে। অন্যদিকে তেহরান মনে করে, তার পারমাণবিক সক্ষমতা ও জ্বালানি নীতি তার সার্বভৌম অধিকারের অংশ। ফলে এই বিষয়টি পাশে রেখে সাময়িক যুদ্ধবিরতি সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
এই সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরান সফর করছেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। পাকিস্তান অতীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। এবারও ইসলামাবাদ হয়তো এমন একটি অবস্থান নিতে চাইছে, যেখানে একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা যাবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্য বজায় থাকবে।
তবে মধ্যস্থতা সফল করতে হলে শুধু বার্তা পৌঁছে দিলেই হবে না। দুই পক্ষের মূল দাবি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে বাস্তবসম্মতভাবে কাছাকাছি আনতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান যেন তার সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়। ইরান চাইছে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং তেল রপ্তানির ওপর চাপ কমানো। এই দুই অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব এখনো অনেক বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিগগিরই একটি চুক্তি হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন অন্তত আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় না। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। এই বক্তব্যই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি—আলোচনা আছে, কিন্তু সমাধান নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি চুক্তির পথে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধ বন্ধের বাস্তব নিশ্চয়তা দরকার। শুধু ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ থামে না; মাঠে বাহিনীর অবস্থান, হামলা বন্ধ, আকাশ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, এবং মিত্র বাহিনীর ভূমিকা—সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো জরুরি। কারণ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশ, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লেবাননের নিরাপত্তা বাস্তবতাও জড়িয়ে আছে।
তৃতীয় বড় বাধা হলো ইরানের জব্দকৃত সম্পদ। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, বিদেশে আটকে থাকা তার অর্থনৈতিক সম্পদ মুক্ত করতে হবে। এই অর্থনৈতিক চাপ ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাই কোনো চুক্তি করতে হলে অর্থনৈতিক ছাড়ের প্রশ্নটি সামনে আসবেই।
চতুর্থ বিষয় হলো তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা। ইরানের অর্থনীতি তেল রপ্তানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল না করে, তাহলে তেহরানের কাছে যেকোনো চুক্তি অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। আবার ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে নিষেধাজ্ঞা হলো চাপ প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার। তাই সহজে এই হাতিয়ার ছেড়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
পঞ্চম এবং সম্ভবত সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা। এই জলপথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল—সবকিছুই প্রভাবিত হতে পারে। তাই হরমুজ প্রশ্নে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তি কল্পনা করা কঠিন।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো আস্থার ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইরান আলোচনার আড়ালে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কূটনীতির কথা বললেও বাস্তবে সামরিক চাপ বজায় রাখছে। এই পারস্পরিক সন্দেহ আলোচনাকে বারবার দুর্বল করে দিচ্ছে।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি তাই এখন এক ধরনের পরীক্ষার মুখে। এটি কি স্থায়ী শান্তির পথে প্রথম ধাপ হবে, নাকি শুধু বড় সংঘর্ষের আগে সাময়িক বিরতি—তা এখনো বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা, বাহরাইন ও কুয়েতে হামলা, এবং হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা দেখাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি কাগজে থাকলেও মাঠে স্থিতিশীলতা নেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কেউই সহজে পিছু হটতে পারছে না। ওয়াশিংটন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া ছাড় দিতে চাইছে না। তেহরান অর্থনৈতিক স্বস্তি ও সার্বভৌম মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া চুক্তিতে যেতে চাইছে না। এর মধ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব, উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলেও শান্তির পথ এখনো স্পষ্ট নয়। আলোচনা চলছে, বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে, মধ্যস্থতার চেষ্টা আছে—কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য যে রাজনৈতিক সাহস ও বাস্তব ছাড় প্রয়োজন, তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি সম্ভব হলেও তা খুব সহজে আসছে না। যুদ্ধ থামানোর পথ খোলা আছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তির দরজা এখনো পুরোপুরি খুলেনি।

