মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন মাসের সংঘাতের পর যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই নতুন একটি পরিকল্পনা সামনে এনে আবারও উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন একটি উদ্যোগ বিবেচনা করছে, যার আওতায় ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর পুনর্গঠন ও ক্ষতিপূরণের কাজে তেহরানের সম্পদ ব্যবহার করা হতে পারে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই নতুন সংকটে ফেলবে না, বরং ইতোমধ্যে নড়বড়ে অবস্থায় থাকা যুদ্ধবিরতিকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইতোমধ্যে একটি বিশেষ দলকে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের নির্দেশ দিয়েছেন।
এই দলের কাজ হবে ইরানের হামলায় সৃষ্ট অবকাঠামোগত ও সামরিক ক্ষতির আর্থিক হিসাব তৈরি করা। শুধু অতীতের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, ভবিষ্যতে যদি নতুন করে কোনো হামলা হয়, সেসব ক্ষতির ক্ষতিপূরণও ইরানের সম্পদ থেকে আদায় করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কোন ধরনের ইরানি সম্পদের ওপর নজর দিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত ভাষা থেকে বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি কেবল জব্দ করা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ বিদেশে থাকা ইরানের অন্যান্য সম্পদও ভবিষ্যতে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিকল্পনার সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এর মাত্র একদিন আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি চূড়ান্ত চুক্তি অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার ওপর।
তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট—তারা চায় তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হোক এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বোঝা কমানো হোক। কিন্তু সেই দাবির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এখন উল্টো সেই সম্পদ অন্য খাতে ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
ফলে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, বাস্তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল।
শুক্রবার রাতে হরমুজ প্রণালির গোরুক ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় রাডার কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, তারা ইরানের ছোড়া কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানায়, জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন দুটি ইরানি ড্রোনও তারা ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী পাল্টা দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে আসা সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
যদিও এতে কিছু স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে, তবে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে বাহরাইনজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুই দেশই এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের ছোড়া ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং সপ্তমটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু সংঘাতের কারণে প্রণালির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরান এখন চায় তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক, তাদের বন্দরের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করা হোক এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হোক।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি শনিবার তেহরানে পৌঁছেছেন। তিনি দেশটির সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির জন্য একটি বিশেষ চিঠি বহন করছেন।
তার সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
এটি ইঙ্গিত করছে যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে চাইছে।
এই যুদ্ধ শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক সংকটই তৈরি করেনি, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন স্পষ্ট।বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হলেও তাদের কাছে এখনও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অস্ত্রভাণ্ডার অবশিষ্ট রয়েছে।তার ভাষায়, ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, তবে হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।দক্ষিণ লেবাননে একটি সামরিক যানে হামলায় লেবাননের দুই কর্মকর্তা ও এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার তদন্ত চলছে।
একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার বা সামরিক অভিযান বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা করছে না।
বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
একদিকে ইরান তাদের আটকে থাকা সম্পদ ফেরত চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সেই সম্পদ ব্যবহার করে মিত্র দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চিন্তা করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে শান্তি আলোচনার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিন মাসের যুদ্ধের পর যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর। সামরিক উত্তেজনা, তেলের বাজারের অস্থিরতা, আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ছোট একটি সিদ্ধান্তও বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করতে পারে।

