মধ্যপ্রাচ্যে টানা উত্তেজনা, সামরিক হামলা এবং অনিশ্চিত শান্তি আলোচনার মধ্যেই নতুন করে সক্রিয় হয়েছে কূটনৈতিক তৎপরতা। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনির কাছে একটি ‘বিশেষ বার্তা’ পৌঁছে দিতে তেহরান সফরে গেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান অচলাবস্থার মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করছে।ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের শততম দিনে এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শনিবার গভীর রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। সেখানে পৌঁছেই তিনি ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নাকভি জানান, আঞ্চলিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ইস্যু এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।তবে কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বার্তা বহন করে তেহরানে গেছেন মহসিন নাকভি।এই বার্তাটি সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
যদিও চিঠির বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুদ্ধবিরতি এবং চলমান শান্তি আলোচনার বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান চাইছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে।কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত নয়।
রোববার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে—এমন দুটি ইরানি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে।এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও সামরিক উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান।
উভয় পক্ষই একদিকে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থানও শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ একদিকে তাদের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় আছে।
ফলে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান বা আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হতে পারে।
তবে বাস্তবে আলোচনার টেবিলে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে।
শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ইরানের বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের জব্দ করা অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যার আওতায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন ও ক্ষতিপূরণে সেই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করা হতে পারে।
ফলে অর্থনৈতিক ইস্যুটি এখন কেবল আর্থিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মহসিন নাকভির এই সফর হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় পরিবর্তন আনবে না। তবে এটি স্পষ্ট যে যুদ্ধের শততম দিনেও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
পাকিস্তান যদি দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন গতি আসতে পারে।
তবে একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা, ইরানের সম্পদ নিয়ে বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে প্রতিটি কূটনৈতিক বার্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিটি সামরিক ঘটনাও পুরো পরিস্থিতিকে নতুন দিকে মোড় নিতে বাধ্য করতে পারে।

