পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাওয়ালাকোটে কয়েকদিন ধরে জমে ওঠা উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘাতে অন্তত চার পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
এই ঘটনা শুধু একটি সংঘর্ষ নয়; এটি আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার গভীর সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার রাতে। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় এক স্থানীয় ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাওয়ালাকোটে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। নিহত ব্যক্তির পরিবার ও সমর্থকরা হাসপাতালের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। প্রথমে শনিবার জানাজার ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত করে মরদেহ হাসপাতালে রাখা হয়।
পরিবারের দাবি ছিল, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএএসি-সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে।কয়েকশ মানুষ কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কর্মসূচি বড় আকার ধারণ করে।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, হাসপাতালের সামনে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান কর্মসূচি চলায় রোগী, স্বজন এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। তাই বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে অনুরোধ করা হয়।কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত না হয়ে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
রোববার রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ এগিয়ে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতাল এলাকা এবং আশপাশে। পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, বিক্ষোভকারীরা পরে আরও সহিংস হয়ে ওঠে এবং সংঘর্ষের সময় চার পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহতদের আগ্নেয়াস্ত্র ও শটগানের গুলিতে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
আজাদ কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিদর্শকের কার্যালয় ঘটনাটিকে “সরাসরি সন্ত্রাসবাদ” হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুরো এলাকায় মোবাইল ডাটা সেবা বন্ধ থাকায় স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে নিহত ব্যবসায়ীর পরিবারের অবস্থান।
তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, সরকার জেএএসি-কে নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা মরদেহ দাফন করবেন না।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন, নিহত ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মতে, এটি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, পুরো আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান।বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘর্ষের গুরুত্ব কেবল প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আজাদ কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি সেই অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উঠে এসেছিল।
সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে বর্তমান সংঘর্ষকে অনেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
বর্তমানে রাওয়ালাকোটসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে, তবে উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি।
একদিকে পুলিশের চার সদস্যের মৃত্যু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের হতাহত হওয়ার ঘটনায় জনমনে ক্ষোভও বাড়ছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, তদন্তের ফলাফল এবং বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাওয়ালাকোটের এই সংঘর্ষ আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন একটি অস্থির অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

