মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবার বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ইরানের বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ।
ওয়াশিংটনে আলোচনা চলছে, ইরানের সম্পদের একটি অংশ ব্যবহার করে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির পুনর্গঠন ও মেরামতের ব্যয় মেটানো যেতে পারে। তবে এই ধারণা প্রকাশ্যে আসার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানের সম্পদ কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নয় এবং সেটি তাদের মিত্রদের ক্ষতিপূরণের তহবিলও হতে পারে না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে যার আওতায় ইরানের জব্দ বা নিয়ন্ত্রিত সম্পদ ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোর যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করা হতে পারে।
খবরে বলা হয়, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের হামলার কারণে উপসাগরীয় মিত্রদের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব নিরূপণ করতে।
শুধু অতীতের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলার ক্ষতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের তহবিল ব্যবহারের ধারণা আলোচনায় রয়েছে।এই খবর প্রকাশের পরই কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় কাজেম গরিবাবাদি বলেন, ইরানের সম্পদকে অন্য দেশের ক্ষতিপূরণের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।তার ভাষায়, ইরানের সম্পদ “ওয়াশিংটনের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নয় এবং এটি কোনো মিত্র রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ তহবিলও নয়।”
তিনি আরও সতর্ক করেন, ইরান সরকারের সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পদ জব্দ, স্থানান্তর বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হলে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের নতুন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।এ ধরনের পদক্ষেপের জবাবে ইরান উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানাবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
গরিবাবাদির বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি দাবি করেছেন যে কিছু আঞ্চলিক সরকার তাদের ভূখণ্ড ও স্থাপনাগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।ফলে তার মতে, এসব দেশ ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করার অবস্থানে নেই।
বরং যুদ্ধের ফলে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোরই বহন করা উচিত।
যুদ্ধ চলাকালে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। তেহরানের দাবি ছিল, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা।সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ছোড়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যে আলোচনা চলছে, সেখানে ইরানের জব্দ সম্পদ অন্যতম বড় অমীমাংসিত বিষয়।তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, বিদেশে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, তেল রপ্তানির বাধা দূর করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আলোচনায় রেখেছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের একটি অংশ মনে করছে, ওই সম্পদ আঞ্চলিক পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।ফলে সম্পদ প্রশ্নটি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান নিজের অর্থনৈতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে আনছে।
ফলে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনও গভীর।বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতি, কূটনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও এখন এই সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
আর সেই কারণেই ইরানের সম্পদ নিয়ে এই নতুন বিরোধ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

