যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্কগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, অস্ত্র সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সমর্থনের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক অনেক সময় প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলেই মনে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদপ্রতিবেদন এই সম্পর্কের ভেতরে থাকা অস্বস্তি, সন্দেহ এবং স্বার্থের সংঘাতকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন ইসরায়েলকে ঘিরে গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকির মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়, অর্থাৎ “সংকটজনক” স্তরে উন্নীত করেছে। বিষয়টি প্রথমে এনবিসি নিউজ এবং পরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করে। সেখানে মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ইসরায়েল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি নীতিনির্ধারক এবং ইরান-সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা বাড়িয়েছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে চাইছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এই আলোচনার ব্যাপারে স্পষ্টভাবেই অস্বস্তিতে আছে। ৭ জুন ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ রবিবার ১০০ দিনে পৌঁছায়। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। ওয়াশিংটন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে, আর ইসরায়েল এখনও ইরান সরকারের পতনকে লক্ষ্য হিসেবে সামনে রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেন্টাগনের মূল্যায়নে কী বলা হয়েছে
এনবিসি নিউজ ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি ইসরায়েল-সংক্রান্ত প্রতিগোয়েন্দা ঝুঁকির মাত্রা “উচ্চ” থেকে বাড়িয়ে “সংকটজনক” করেছে। এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় “সংকটজনক” হলো সবচেয়ে গুরুতর সতর্কতার স্তর।
মূল উদ্বেগটি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ঘিরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন নীতি আলোচনার ভেতরের অবস্থান, আলোচনার কৌশল এবং সম্ভাব্য সমঝোতার দিক সম্পর্কে ইসরায়েল আরও বিস্তারিত জানতে চাইছে বলে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন সামরিক ও সরকারি ব্যক্তিদের ওপর ইসরায়েলি নজরদারির প্রচেষ্টা বেড়েছে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচক স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি কর্মকর্তা এলব্রিজ এ. কোলবি এবং তাঁর সহকারী মাইকেল পি. ডিমিনো চতুর্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টিভ উইটকফ ইরান-সংক্রান্ত পারমাণবিক আলোচনায় প্রধান আলোচক ছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার আগে তিনি ওই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই তথ্যগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই যে, কূটনৈতিক আলোচনা চলার সময় কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্র যদি আলোচনার ভেতরের অবস্থান জানতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে, তাহলে সেটি শুধু নিরাপত্তা ইস্যু থাকে না। এটি সরাসরি আস্থার সংকটে পরিণত হয়।
মুঠোফোনে নজরদারির অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলে কাজ করা কিছু মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মী তাঁদের মুঠোফোনে গোপনে এমন নজরদারি ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল বলে সন্দেহ করেন, যার মাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এই অভিযোগও প্রকাশ করেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা সহযোগিতা থাকলেও সহযোগিতা এবং গোপন নজরদারির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আছে। কোনো মিত্র রাষ্ট্রের নীতি আলোচনার ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা সেই সীমারেখা অতিক্রম করেছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরান আলোচনা কেন এই বিরোধের কেন্দ্র
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ সব সময় একই ছিল না। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় সামরিক চাপের পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখতে চেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের চাপ কমাতে এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে চাইছে। কিন্তু ইসরায়েলের আশঙ্কা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কাঠামোতে পৌঁছায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রিয়াস ক্রেইগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখলেও, স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে ওয়াশিংটনকেও গোয়েন্দা লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অবস্থান জানা নয়। প্রয়োজনে সেই আলোচনাকে প্রভাবিত, বিলম্বিত বা দুর্বল করার সুযোগ খোঁজাও এর অংশ হতে পারে।
এই বিশ্লেষণ মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মিত্রতা সব সময় অভিন্ন স্বার্থের নিশ্চয়তা দেয় না। যুদ্ধ, পারমাণবিক আলোচনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সরকার পরিবর্তনের মতো বড় প্রশ্নে একই জোটের ভেতরেও ভিন্ন হিসাব তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য দূরত্ব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তেজনা প্রকাশ্যে এসেছে। এমন প্রতিবেদনও আছে যে লেবাননে ইসরায়েলের উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩,৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতাও জটিল হয়ে উঠছে। কারণ ইরান লেবানন ও ইরান—দুই ইস্যুকেই পরস্পর সম্পর্কিত হিসেবে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ হিসেবে আলোচনা বেছে নেয়, কিন্তু ইসরায়েল যদি সামরিক চাপ বাড়াতে থাকে, তাহলে ওয়াশিংটনের আলোচনাক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের কাছে এটি এমন বার্তা দিতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান এক নয়।
ইরান এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখতে পারে
বিশ্লেষক রব গাইস্ট পিনফোল্ডের মতে, ইরান সম্ভবত এই ঘটনাকে শত্রুদের মধ্যে মতভেদ ও ভুল হিসাব হিসেবে দেখবে। তাঁর বিশ্লেষণে, তেহরানের কাছে এটি সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে নীতিগত দূরত্ব ইরানের জন্য আলোচনার সুযোগ বাড়াতে পারে।
তবে তিনি একই সঙ্গে একটি বড় ঝুঁকির কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি দেখায় যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই একতরফা পদক্ষেপ নিতে আরও আগ্রহী বা সক্ষম হতে পারে। অর্থাৎ ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল মতভেদ যেমন কূটনৈতিক সুযোগ, তেমনি আকস্মিক সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকিও তৈরি করে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন আলোচনা চায়, অন্যদিকে তেল আবিব নিজের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে রেখে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। ফলে কোনো ভুল পদক্ষেপ বা ভুল বার্তা পুরো অঞ্চলকে নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তা বা মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর ইসরায়েল গুপ্তচরবৃত্তি করে—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েল মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে না।
একজন হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাও এনবিসির প্রতিবেদনকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, পুরো ঘটনা মিথ্যা এবং এমন একজনের সূত্রে এসেছে যার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান নেই।
অন্যদিকে আল জাজিরা জানিয়েছে, তারা সংবাদপ্রতিবেদনগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই বিষয়টি এখনও অভিযোগ, সংবাদপ্রতিবেদন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পর্যায়ে আছে। তবে অভিযোগের গুরুত্ব কমে যায় না, কারণ এমন মূল্যায়ন পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রকাশ করে।
অতীতের প্রেক্ষাপট: জোনাথন পোলার্ড ঘটনা
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নতুন নয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো জোনাথন পোলার্ড মামলা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একজন বেসামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, কারণ তিনি ইসরায়েলের কাছে বিপুল পরিমাণ গোপন তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। পরে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং ৩০ বছর কারাগারে থাকার পর ২০১৫ সালে প্যারোলে মুক্তি পান।
পোলার্ড ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম বড় গুপ্তচরবৃত্তি কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত। এই ঘটনার স্মৃতি এখনও মার্কিন গোয়েন্দা মহলের একাংশের মধ্যে প্রভাব রাখে। ফলে নতুন করে ইসরায়েলি তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ সামনে এলে সেটি শুধু একটি সাম্প্রতিক সংবাদ থাকে না। বরং পুরোনো অবিশ্বাসের স্মৃতিও নতুন করে আলোচনায় আসে।
ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সন্দেহ কেন থাকে
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মিত্রতা মানে সব সময় পূর্ণ আস্থা নয়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ অনেক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও ঘটে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই তথ্য সংগ্রহ কত দূর পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ ওয়াশিংটন বছরের পর বছর ইসরায়েলকে বিপুল সামরিক সহায়তা দিয়েছে, অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় এমন একটি প্রতিরক্ষা বিলের অংশ নিয়েও আলোচনা চলছে, যার মাধ্যমে দুই দেশের অস্ত্র গবেষণা ও উন্নয়ন আরও গভীরভাবে একীভূত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন সময়েই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ সামনে আসা দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ককে অস্বস্তিকর আলোচনায় ফেলেছে।
ওবামা আমল থেকে ট্রাম্প আমল
ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় নেতানিয়াহুর বিরোধিতা নতুন নয়। বারাক ওবামার সময়ে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি হয়। পরে ট্রাম্প ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। মোর্তাজাভির বিশ্লেষণে, নেতানিয়াহু কখনোই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গুরুতর আলোচনা, সমঝোতা বা স্বাভাবিক সম্পর্ক চাননি।
বর্তমান যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি আরও বলেছেন, এটি পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এগোয়নি। তাঁর মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হতে চান এবং তা করতে হলে কূটনীতির পথেই এগোতে হবে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং ইসরায়েলের স্বার্থ আর আগের মতো মিলে যাচ্ছে না। বরং দুই দেশের অবস্থান ক্রমেই আলাদা হচ্ছে।
বড় চিত্র: মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রতার নতুন হিসাব
এই ঘটনাকে শুধু “কে কাকে গুপ্তচরবৃত্তি করল” প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এখানে কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথম প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় যেতে পারে, যা ইসরায়েলের সামরিক কৌশলকে সীমিত করবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক পথ ব্যবহার করছে। তৃতীয় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত, এবং নেতানিয়াহু সরকার সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে পেন্টাগনের মূল্যায়ন যদি সত্যিই “সংকটজনক” পর্যায়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে গভীর অনাস্থার ইঙ্গিত দেয়। প্রকাশ্যে দুই দেশ এখনও মিত্র। কিন্তু নীতির স্তরে, বিশেষ করে ইরান, লেবানন ও গাজা ইস্যুতে তাদের অবস্থান ক্রমেই আলাদা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ককে সাধারণত অটুট কৌশলগত সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো দেখাচ্ছে, সেই সম্পর্কের ভেতরেও সন্দেহ, চাপ এবং প্রতিযোগী স্বার্থ কাজ করছে। ইরান-সংক্রান্ত আলোচনার সময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ার অভিযোগ শুধু একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
যদি ওয়াশিংটন আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি চায় এবং তেল আবিব সামরিক চাপ বজায় রাখতে চায়, তাহলে এই দুই পথের সংঘর্ষ আরও প্রকাশ্য হতে পারে। সেই সংঘর্ষ শুধু যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান, লেবানন, গাজা এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বাস্তবতায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই পেন্টাগনের এই সংকটজনক মূল্যায়নকে কেবল একটি গোয়েন্দা সতর্কতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মিত্রতার আড়ালে জমে থাকা স্বার্থের সংঘাত, কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক শক্তির নতুন হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

