যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার একশতম দিন। এই একশ দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ অবরোধ ও পাল্টা আঘাতের দৃশ্য দেখা গেছে, তেমনি কূটনীতির পর্দার আড়ালেও চলেছে অস্থির টানাপোড়েন। কখনো মনে হয়েছে, যুদ্ধ থামানোর একটি বড় সমঝোতা বুঝি হাতের নাগালেই। আবার পরের মুহূর্তেই দেখা গেছে, পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবানন, হরমুজ প্রণালি, অবরোধ ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে সেই সম্ভাবনা ভেঙে পড়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের সূচনা হয়, তা দ্রুতই আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় সংকটে রূপ নেয়। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে যে সামরিক অভিযান চালায়, তার নাম দেওয়া হয় এপিক ফিউরি অভিযান। এর জবাবে ইরান শুধু ইসরায়েলকেই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদকেও লক্ষ্যবস্তু করে। ফলে সংঘাতটি আর কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগিয়ে যায়।
৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হলে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি মানেই স্থায়ী শান্তি নয়—এই বাস্তবতা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার ভেঙে পড়া, এরপর পাকিস্তানের মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব আদান-প্রদান, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল নিয়ে জটিলতা এবং ইরানি বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ—সব মিলিয়ে শান্তির পথ বারবার খুলেছে, আবার বন্ধও হয়েছে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধ থামাতে শুধু একটি যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট ছিল না। ইরান চাইছিল লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হোক, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড় দেওয়া হোক এবং তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা-স্বার্থকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পষ্ট নিশ্চয়তা দিক। অর্থাৎ দুই পক্ষই শান্তি চাইছিল, কিন্তু শান্তির সংজ্ঞা দুই পক্ষের কাছে এক ছিল না।
ইসলামাবাদের সরাসরি আলোচনা: আশা জাগিয়েও ভেঙে পড়া প্রথম বড় সুযোগ
১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় বসেন। ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সরাসরি বৈঠকগুলোর একটি। পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন উপপ্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের পক্ষে আলোচনায় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও প্রধান পারমাণবিক আলোচক আলি বাঘেরি কানি।
আলোচনার আগে গালিবাফ স্পষ্ট করে দেন, ইরানের কাছে দুটি বিষয় আপসের বাইরে। প্রথমত, লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি; দ্বিতীয়ত, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা। এই অবস্থান বোঝা জরুরি, কারণ ইরান যুদ্ধকে শুধু নিজের ভূখণ্ডে হামলার প্রশ্ন হিসেবে দেখছিল না; তারা এটিকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, মিত্রগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছিল।
২ মার্চ থেকে ইসরায়েল লেবাননে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ তেহরানে প্রাথমিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় উত্তর ইসরায়েলে আঘাত হানার পর এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা ইসরায়েলের দখলে চলে যায়। ফলে লেবানন ইস্যু ইরানের কাছে কেবল একটি পার্শ্ব-সংকট ছিল না; এটি ছিল বৃহত্তর যুদ্ধ-সমঝোতার অপরিহার্য শর্ত।
ইসলামাবাদের বৈঠক ঘিরে আশাবাদ কম ছিল না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আলোচনার আগের রাতেই এটিকে স্থায়ী শান্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরেন। আলোচনাটি তৃতীয় দিন পর্যন্ত গড়াতে পারে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছিল। ইরানি কর্মকর্তারা নাকি আরও সময় নিয়ে আলোচনায় থাকতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষে প্রক্রিয়াটি গুটিয়ে নেয়।
সমস্যার মূল জায়গা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, ইরান যেন শুধু তাৎক্ষণিকভাবে নয়, দীর্ঘমেয়াদেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না যাওয়ার স্পষ্ট অঙ্গীকার দেয়। ওয়াশিংটনের মতে, তাদের প্রস্তাব ছিল চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম। কিন্তু তেহরান সেটি গ্রহণ করেনি। ইরানের দৃষ্টিতে আলোচনাটি ব্যর্থতা নয়, বরং একটি প্রক্রিয়ার সূচনা। ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রদূতও ইঙ্গিত দেন, এই বৈঠক ভবিষ্যৎ যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আর কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি।
পারমাণবিক প্রশ্ন: সমঝোতার সবচেয়ে কঠিন পাঁচ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে ওঠে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কাছে আনুমানিক ৪৪০ কেজি, অর্থাৎ ৯৭০ পাউন্ড, ইউরেনিয়াম রয়েছে যা ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ। অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রা ৯০ শতাংশ হলেও ৬০ শতাংশে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, কারণ সেখান থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে, অস্ত্র তৈরির জন্য নয়। কিন্তু ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ হলো, ইরান এমন সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। তাদের যুক্তি, বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট। সেই তুলনায় ৬০ শতাংশ মাত্রা অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, ইরান তার ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করুক। কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে। এখানেই আলোচনার অচলাবস্থা স্পষ্ট হয়। দুই পক্ষ হয়তো অনেক বিষয়ে কাছাকাছি এসেছিল, কিন্তু পারমাণবিক মজুত, ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধকরণ এবং চুক্তির ধাপ নির্ধারণের বিষয়ে তারা এক জায়গায় দাঁড়াতে পারেনি।
ইরান বিশ্লেষক নায়সান রাফাতির মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রতিবারই কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছিল, আবার কিছু বিষয়ে গভীর অচলাবস্থা থেকে গেছে। তাঁর বিশ্লেষণের সারকথা হলো, কোনো চুক্তিতে ৯৫ শতাংশ বিষয়ে ঐকমত্য হলেও বাকি ৫ শতাংশই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল শুরুতেই স্পষ্টতা; ইরান চাইছিল অনেক বিষয় পরে বিস্তারিত আলোচনায় নেওয়া হোক। এই পার্থক্য শুধু কৌশলগত নয়, আস্থার সংকটেরও প্রতিফলন।
ইসলামাবাদ আলোচনার ভেঙে পড়ার চার দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগামী ও বন্দরত্যাগী জাহাজ চলাচলে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয় কমানো। এই সিদ্ধান্ত আলোচনার বাকি থাকা ইতিবাচক আবহকেও দুর্বল করে দেয়। কূটনীতির ভাষায় যাকে চাপ সৃষ্টির কৌশল বলা যায়, তেহরানের চোখে সেটি ছিল শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।
লেবানন যুদ্ধবিরতি: বিস্তৃত শান্তির সম্ভাবনা, কিন্তু মাঠে ভিন্ন বাস্তবতা
১৬ এপ্রিল ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইসরায়েল ও লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যাতে স্থায়ী নিরাপত্তা ও শান্তি চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়। এই ঘোষণা আসে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে ছয় সপ্তাহের লড়াইয়ের পর। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই সংঘাত ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ফ্রন্টগুলোর একটি, কারণ এখানে ইরানের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরায়েলি বাহিনীর মুখোমুখি ছিল।
তেহরান বারবার জানিয়েছিল, লেবাননে সংঘাত বন্ধ না হলে বৃহত্তর শান্তি পরিকল্পনা এগোবে না। তাই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি অনেকের কাছে বড় আশার আলো হিসেবে দেখা দেয়। ধারণা করা হয়েছিল, লেবাননে আগুন কমলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাও গতি পাবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যায়। ২ মার্চ থেকে লেবাননে ৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং দশ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। নরওয়েজীয় শরণার্থী পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরের মাসেই প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত হয়। ফলে যুদ্ধবিরতি কাগজে থাকলেও মাঠে তার প্রভাব সীমিত ছিল।
এখানে মূল প্রশ্ন ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। ইরান যদি দেখে, লেবানন নিয়ে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না, তাহলে বৃহত্তর শান্তি চুক্তিতে সে কেন আস্থা রাখবে? তেহরানের কাছে লেবাননে শান্তি ছিল এক ধরনের লাল রেখা। অন্যদিকে ইসরায়েল নিরাপত্তা যুক্তি তুলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে একটি আঞ্চলিক সংকট পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার গতি থামিয়ে দেয়।
হরমুজ প্রণালি: সমুদ্রপথ যখন আলোচনার কেন্দ্রে
১৭ এপ্রিল, লেবানন যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরদিন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলো। ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রণালিটি ব্যবসা ও পূর্ণ চলাচলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
প্রথম দেখায় এটি ছিল বড় ইতিবাচক সংকেত। কারণ হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক জলপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিরা। যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ এই সরু জলপথ দিয়ে যেত। মার্চের শুরু থেকে ইরান এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। কিছু নির্বাচিত দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেলেও তাদের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা করতে হতো। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে কিছু জাহাজকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে জানা যায়।
ইরান আগের শান্তি প্রস্তাবগুলোতে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ফি বা টোল নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এই ধারণা বারবার প্রত্যাখ্যান করে। ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল, যুদ্ধের আগের অবাধ চলাচলের অবস্থায় ফিরতে হবে। তেহরান চাইছিল, অন্তত কিছু মাত্রায় প্রণালির ওপর তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকুক।
আরাঘচির ঘোষণার পরও পরিস্থিতি বদলায়নি। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষের চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে। ইরান এর জবাবে জানায়, যদি তার নিজস্ব জাহাজ চলাচল করতে না পারে, তাহলে অন্যদেরও চলাচল করতে দেওয়া হবে না। এরপর থেকে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের ওপর গুলি চালানো বা জব্দ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত চাপের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইরানের কাছে এটি ছিল প্রতিরোধের উপায়; যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। ফলে পারমাণবিক আলোচনার পাশাপাশি সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণও শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে চলে আসে।
নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ফোন: চাপ কি সত্যিই বদল আনতে পারত?
১ জুন ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস দুই অজ্ঞাত যুক্তরাষ্ট্র কর্মকর্তা এবং আলোচনার বিষয়ে অবগত আরেক সূত্রের বরাতে জানায়, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ফোনালাপ হয়।
এর আগের দিন ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকার কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বফোর্ট দুর্গ এবং তার আশপাশের রিজ দখল করে। জায়গাটি লিতানি নদীর দিকে নজর রাখে এবং সেখান থেকে উত্তর ইসরায়েল পর্যন্ত দেখা যায়। এই সামরিক অগ্রগতি তেহরানের কাছে বড় সংকেত ছিল। ইরান তখন সতর্ক করেছিল, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে তারা আলোচনা থেকে সরে যেতে পারে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁকে অকৃতজ্ঞতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এমনকি তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে অস্থির আচরণের জন্যও সমালোচনা করেন। এই খবরের পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলের ওপর বাস্তব চাপ প্রয়োগ করবেন এবং লেবাননে হামলা থামাতে বাধ্য করবেন।
কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি। অজ্ঞাত এক ইসরায়েলি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ করতে পারে। বাস্তবে হামলা অব্যাহত থাকে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আরেকটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও শুক্রবার ইসরায়েল নাকুরা এলাকায় হামলা চালায়। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলার দুওয়েইর শহরে একটি ভবনে রাতের ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন নিহত হন। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আরনায়া, আনকুন ও কফর কিলাসহ দক্ষিণ লেবাননের তিনটি গ্রাম ও শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ থাকলেও মাঠের বাস্তবতা বদলানো সহজ নয়। ইসরায়েলের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার, ইরানের আঞ্চলিক শর্ত এবং লেবাননের মানবিক বিপর্যয়—এই তিনটি স্তর একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে কেবল ফোনালাপ বা ঘোষণামাত্র দিয়ে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায়নি।
কেন বারবার ভেঙে গেল সমঝোতার সম্ভাবনা
এই একশ দিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমস্যা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নয়। পারমাণবিক প্রশ্ন অবশ্যই কেন্দ্রে আছে, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেবানন, হরমুজ প্রণালি, নৌ অবরোধ, জ্বালানি বাণিজ্য, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং নিষেধাজ্ঞা-সম্পর্কিত অর্থনৈতিক চাপ।
দ্বিতীয়ত, দুই পক্ষের আলোচনার সময়সূচি ও অগ্রাধিকার আলাদা। ইরান অনেক বিষয় ধাপে ধাপে আলোচনা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কাঠামো চায়। এই পার্থক্য আলোচনার ভাষাকে কঠিন করে তুলেছে।
তৃতীয়ত, মাঠে সংঘাত চলতে থাকলে আলোচনার টেবিলে আস্থা তৈরি হয় না। ইসলামাবাদে আলোচনা চলার পরও নৌ অবরোধ, লেবাননে হামলা, হরমুজে চাপ—এসব ঘটনা বারবার কূটনৈতিক অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিয়েছে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল, লেবানন এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতা—সবকিছু মিলিয়ে এই সংকট বহুস্তরীয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চাইলে একা একা পুরো সমাধান করতে পারবে না, কারণ সংঘাতের প্রভাব ও কার্যকারক শুধু তাদের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়।
পঞ্চমত, অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মধ্যে একটি গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরান হরমুজ প্রণালি, ইউরেনিয়াম মজুত ও আঞ্চলিক অবস্থানকে দরকষাকষির শক্তি হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে। এই দুই কৌশল সংঘাত কমানোর বদলে অনেক সময় আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
সামনে কী হতে পারে
একশ দিন পরও শান্তি অনিশ্চিত। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পারস্পরিক ছাড় এবং আস্থার বাস্তব প্রমাণ। শুধু ঘোষণায় নয়, মাঠে হামলা বন্ধ হওয়া, সমুদ্রপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত হওয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কার্যকর কাঠামো তৈরি হওয়া এবং অর্থনৈতিক অবরোধের প্রশ্নে বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে পাওয়া জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ইরানকে কীভাবে পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি করানো যায়, অথচ তাকে পুরোপুরি কোণঠাসা না করা হয়। ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের দাবি বজায় রেখে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমাবে। ইসরায়েলের জন্য প্রশ্ন হলো, লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে কি তারা নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে, নাকি বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। আর পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, ভেঙে পড়া যোগাযোগের সেতু আবার কীভাবে জোড়া লাগানো যায়।
যুদ্ধের একশতম দিনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শান্তির খুব কাছে পৌঁছানো মানেই শান্তি অর্জন নয়। কখনো কখনো শেষ কয়েক ধাপই সবচেয়ে কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষেত্রেও তাই দেখা যাচ্ছে। আলোচনা হয়েছে, প্রস্তাব এসেছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছে, হরমুজ খোলার ইঙ্গিত এসেছে, এমনকি মিত্রের ওপর চাপ প্রয়োগের কথাও শোনা গেছে। তবু চুক্তি হয়নি।
কারণ এই সংকটে প্রতিটি বিষয় আরেকটির সঙ্গে বাঁধা। পারমাণবিক মজুতের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, লেবাননের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান, হরমুজের চলাচলের সঙ্গে তেলের অর্থনীতি, আর ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি এমন এক জটিল সমীকরণ, যেখানে সামান্য অমিলও পুরো প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে।
তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কতবার চুক্তির কাছাকাছি গিয়েছিল। বড় প্রশ্ন হলো, তারা কি শেষ পর্যন্ত সেই কঠিন বাকি অংশটুকু অতিক্রম করতে পারবে? নাকি একের পর এক ব্যর্থ সুযোগই এই যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে?

