উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি কি এখনো আগের মতো চীনের ঘনিষ্ঠ ছায়ার ভেতরে আছেন, নাকি রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর করে নিজের কূটনৈতিক দর-কষাকষির জায়গা আরও শক্ত করেছেন? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে বোঝা যায়, পিয়ংইয়ং আর শুধু বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল ছোট মিত্র নয়; বরং সে এখন চীন ও রাশিয়া—দুই শক্তিধর প্রতিবেশীর মাঝখানে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কিম জং উনের রাশিয়া সফর বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। উত্তর কোরিয়া থেকে রাশিয়ার পথে তার বিশেষ ট্রেনযাত্রা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। অনেকে সেই ট্রেনকে ‘চলন্ত দুর্গ’ বলেও আখ্যা দিয়েছিল। সেই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের নতুন ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ্য ঘোষণা।
এরপর ২০২৪ সালের জুনে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন উত্তর কোরিয়া সফরে যান। এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার গুরুত্ব বাড়ছিল, আর উত্তর কোরিয়ার জন্য রাশিয়া হয়ে উঠছিল সামরিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সমর্থনের একটি বড় উৎস।
তারপর ২০২৫ সালে কিম জং উন তার মেয়ে কিম জু এইকে নিয়ে চীনের ‘বিজয় দিবস’ উদযাপনে যোগ দিতে বেইজিং যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে চীনের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকীর সেই আয়োজনে পুতিনসহ আরও কয়েকজন বিশ্বনেতা উপস্থিত ছিলেন। বেইজিংয়ের সেই দৃশ্য ছিল প্রতীকী—শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও কিম জং উন একই রাজনৈতিক মঞ্চে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিপরীতে এক ধরনের শক্তি প্রদর্শন।
কিন্তু প্রতীকী ঐক্যের আড়ালে প্রশ্ন থেকেই যায়—কিম জং উনকে নিয়ে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে?
উত্তর কোরিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
উত্তর কোরিয়ার অবস্থান বোঝার জন্য কোরীয় উপদ্বীপের ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া কোরীয় যুদ্ধ ১৯৫৩ সালে শেষ হলেও উপদ্বীপের বিভক্তি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়। উত্তর অংশে কমিউনিস্ট শাসিত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, আর দক্ষিণ অংশ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তির নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়।
উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া। আয়তন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার। দেশটির সঙ্গে চীনের স্থলসীমা প্রায় ১ হাজার ৩৫২ কিলোমিটার। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার স্থলসীমা তুলনামূলকভাবে ছোট, প্রায় ১৭ কিলোমিটার। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার।
এই ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর কোরিয়াকে একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে কৌশলগতভাবে মূল্যবান করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তা জোটের বিপরীতে পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বেইজিং ও মস্কো শুধু প্রতিবেশী নয়; তারা টিকে থাকার নিরাপত্তা বলয়।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন। অতীতে উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ভরসা ছিল চীন। রাশিয়া ছিল ঐতিহাসিক মিত্র, কিন্তু কার্যকর প্রভাবের দিক থেকে চীনের তুলনায় পিছিয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া এখন উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে সামরিক সহায়তা, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জনবলসংক্রান্ত সহযোগিতা পাচ্ছে বলে পশ্চিমা সূত্রগুলো দাবি করে। বিনিময়ে পিয়ংইয়ং মস্কোর কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার আশা করছে।
শি জিনপিং কেন পিয়ংইয়ং গেলেন
৮ জুন ২০২৬ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পিয়ংইয়ং যান। এটি ছিল প্রায় সাত বছর পর তার উত্তর কোরিয়া সফর। শি সাধারণত বিদেশ সফর কম করেন। তাই তিনি কোন দেশে যাচ্ছেন, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পায়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে করোনা মহামারির দীর্ঘ বিরতির পর তিনি মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান সফর করেন। ২০২৩ সালে যান রাশিয়ায়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে তার মস্কো সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি ১১ বার রাশিয়া সফর করেন, যা চীনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের মে মাসে তিনি ইউরোপের ফ্রান্স, সার্বিয়া ও হাঙ্গেরি সফর করেন। তখন ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নতুন হিসাবের মুখে পড়েছিল। ২০২৫ সালে তিনি ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়া সফরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ান।
চলতি বছর তিনি বিদেশ সফর শুরু করলেন উত্তর কোরিয়া দিয়ে। এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ সৌজন্য সফর হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি এমন সময়ে ঘটল, যখন পিয়ংইয়ং মস্কোর সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বেইজিংয়ের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ উত্তর কোরিয়া যদি রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপে চীনের প্রভাব কমে যেতে পারে।
চীন উত্তর কোরিয়াকে হারাতে চায় না। আবার উত্তর কোরিয়ার অতি আগ্রাসী পারমাণবিক অবস্থানও বেইজিংয়ের জন্য সবসময় সুবিধাজনক নয়। চীন চায় উপদ্বীপে উত্তেজনা থাকুক, কিন্তু তা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। কারণ কোনো বড় সংঘাত শুরু হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে চীনের সীমান্ত, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায়।
অর্থনীতি, সীমান্ত ও প্রভাবের হিসাব
শি জিনপিংয়ের সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বড় জায়গা পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, মহামারিজনিত বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ভুগছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পুনরুদ্ধার, সীমান্তপথ খুলে দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটন—এসব ক্ষেত্র পিয়ংইয়ংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন উত্তর কোরিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। খাদ্য, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও সীমান্তভিত্তিক অর্থনৈতিক লেনদেনে পিয়ংইয়ং বহুদিন ধরে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই কিম জং উন রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও চীনকে পুরোপুরি পাশ কাটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।
এখানেই কিমের কৌশল স্পষ্ট। তিনি নিরাপত্তা ও সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছেন, আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখছেন। এতে তিনি দুই দিক থেকেই সুবিধা নিতে পারেন। মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে বেইজিংকে চাপ দেওয়া যায়; আবার বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দেখিয়ে মস্কোকেও বোঝানো যায় যে পিয়ংইয়ংয়ের বিকল্প দরজা খোলা আছে।
এটি ছোট রাষ্ট্রের সাধারণ কৌশল নয়; এটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কার্যকর ভারসাম্যনীতি। কিম জানেন, তার দেশের দুর্বল অর্থনীতি একা দাঁড়ানোর মতো শক্তিশালী নয়। কিন্তু তার পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও সামরিক অবস্থান তাকে এমন এক দর-কষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে, যা সাধারণ দুর্বল রাষ্ট্রের থাকে না।
চীন কেন অস্বস্তিতে
চীনের অস্বস্তির মূল কারণ হলো প্রভাব হারানোর আশঙ্কা। উত্তর কোরিয়া ঐতিহাসিকভাবে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। বেইজিং উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে দেখে, কিন্তু পিয়ংইয়ং কখনোই পুরোপুরি চীনের নির্দেশ মেনে চলে না।
চীন চায় না উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাক। কারণ এতে কোরীয় উপদ্বীপে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান নিজেদের নিরাপত্তা নীতিতে আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অজুহাত পাবে।
অন্যদিকে রাশিয়া এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় মস্কোর কাছে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সহায়তা মূল্যবান। ফলে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে রাজনৈতিকভাবে বেশি ছাড় দিতে প্রস্তুত। এমনকি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার ইঙ্গিতও মস্কোর অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
এখানেই বেইজিংয়ের দুশ্চিন্তা। যদি মস্কো কিমকে এমন সমর্থন দেয়, যা চীন দিতে চায় না বা দিতে পারে না, তাহলে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। তাই শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরকে শুধু বন্ধুত্বের প্রদর্শন নয়, বরং প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
রাশিয়া কী চাইছে
রাশিয়ার চাওয়া তুলনামূলকভাবে সরাসরি। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মস্কোর সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ, শ্রমশক্তি ও কৌশলগত অংশীদারের প্রয়োজন বেড়েছে। উত্তর কোরিয়া এই ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অংশীদার। দেশটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। তাই নতুন নিষেধাজ্ঞার ভয় তাকে খুব বেশি আটকে রাখতে পারে না।
উত্তর কোরিয়ার কাছে বিপুল সামরিক মজুত আছে। দেশটির সেনাবাহিনী বড়, আর অস্ত্রশিল্পও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। রাশিয়ার জন্য এমন অংশীদার যুদ্ধের সময়ে মূল্যবান। বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট সহায়তা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, জ্বালানি, খাদ্য ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন চাইতে পারে।
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত উত্তর কোরীয় সেনাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়তে গিয়ে কয়েক হাজার উত্তর কোরীয় সেনা প্রাণ হারিয়েছে, সংখ্যাটি ৬ হাজারের বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। এই দাবি সত্য হলে তা মস্কো-পিয়ংইয়ং সম্পর্কের গভীরতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশ অন্য দেশের যুদ্ধে এত বড় মানবিক মূল্য দিলে সম্পর্কটি আর শুধু কাগুজে মিত্রতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন তা কৌশলগত নির্ভরতার পর্যায়ে চলে যায়।
কিমের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ
কিম জং উনের সবচেয়ে বড় লাভ হলো তার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন উত্তর কোরিয়াকে বিচ্ছিন্ন, দরিদ্র ও নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিম নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরছেন যেন তিনি বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনশীল শক্তির অংশ।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তাকে সামরিক মর্যাদা দিচ্ছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে অর্থনৈতিক শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে উত্তেজনা তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দিচ্ছে।
কিম জানেন, তার দেশের অর্থনীতি দুর্বল হলেও তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী। তিনি চীন ও রাশিয়ার মাঝখানে এমনভাবে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে দুই শক্তিই তাকে পুরোপুরি হারাতে চায় না। এই অবস্থান তাকে দর-কষাকষির ক্ষমতা দিচ্ছে।
তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। রাশিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত সামরিক ঘনিষ্ঠতা চীনকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। আবার চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উত্তর কোরিয়ার স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। তাই কিমের লক্ষ্য সম্ভবত এক পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং দুই পক্ষকে ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্ত করা।
পারমাণবিক প্রশ্নে নীরবতা
শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার অনুপস্থিতি। অতীতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল বেইজিংয়ের জন্য অস্বস্তিকর বিষয়। চীন প্রকাশ্যে উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা ও নিরস্ত্রীকরণের কথা বলত।
কিন্তু এবার আলোচনার কেন্দ্র ছিল সম্পর্ক, অর্থনীতি, কৌশলগত সমন্বয় ও আঞ্চলিক অবস্থান। এটি কিমের জন্য বড় কূটনৈতিক সুবিধা। কারণ পারমাণবিক ইস্যু সামনে না এলে পিয়ংইয়ং নিজেকে চাপের মুখে নয়, বরং সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
চীনের জন্যও বিষয়টি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত হতে পারে। বেইজিং হয়তো বুঝেছে, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরানো এখন প্রায় অসম্ভব। তাই সরাসরি চাপের বদলে প্রভাব বজায় রাখাই আপাতত বেশি কার্যকর পথ।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের জন্য বার্তা
চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জন্য বড় কৌশলগত সংকেত। কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা শুধু দুই কোরিয়ার সমস্যা নয়; এটি এখন বৃহত্তর শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আছে। জাপানও নিরাপত্তা নীতি পুনর্গঠন করছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের কূটনৈতিক সক্রিয়তা মিলিয়ে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে পিয়ংইয়ং নিজেকে শুধু প্রতিরক্ষামূলক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম এক খেলোয়াড় হিসেবে উপস্থাপন করছে। পশ্চিমা বিশ্ব তাকে যত বিচ্ছিন্ন করতে চায়, সে ততই মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দেখিয়ে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে।
সামনে কী হতে পারে
সামনের দিনগুলোতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথমত, চীন কতটা অর্থনৈতিক সহায়তা ও সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ায় তা দেখতে হবে। যদি বেইজিং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, পর্যটন ও অবকাঠামো সহযোগিতা দ্রুত বাড়ায়, তাহলে বোঝা যাবে চীন প্রভাব ধরে রাখতে সক্রিয়ভাবে এগোচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে কী ধরনের সামরিক বা প্রযুক্তিগত সুবিধা দেয় তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্যাটেলাইট, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ও উন্নত অস্ত্রপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন এলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, কিম জং উন কীভাবে দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রাখেন সেটাই হবে মূল প্রশ্ন। তিনি যদি রাশিয়ার দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েন, চীন অসন্তুষ্ট হতে পারে। আবার চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা মস্কোর কাছে পিয়ংইয়ংয়ের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান কী প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
শেষ কথা
কিম জং উনকে নিয়ে শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে প্রকাশ্য কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু কূটনীতিতে সব প্রতিযোগিতা উচ্চস্বরে হয় না। অনেক সময় হাসিমুখের বৈঠক, আনুষ্ঠানিক সফর ও বন্ধুত্বের ভাষার আড়ালেই প্রভাবের আসল লড়াই চলে।
চীন উত্তর কোরিয়াকে নিজের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে ধরে রাখতে চায়। রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধকালীন কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আর কিম জং উন এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন।
তাই প্রশ্নটি শুধু “কিম কার দিকে?” নয়। বড় প্রশ্ন হলো—কিম কতটা দক্ষতার সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রতিযোগিতাকে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে পারবেন।
এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, পিয়ংইয়ং আর শুধু সাহায্যপ্রার্থী মিত্র নয়। উত্তর কোরিয়া এখন এমন এক রাষ্ট্র, যার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা বেইজিং ও মস্কো—দুই পক্ষের জন্যই প্রয়োজনীয়। আর এই প্রয়োজনীয়তাই কিম জং উনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি।

