জার্মানির ড্রেসডেন শহরে গত বছরের শেষ দিকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ঘটে গেছে। ফোক্সওয়াগেনের বিখ্যাত “ট্রান্সপারেন্ট ফ্যাক্টরি” থেকে সর্বশেষ গাড়িটি বের হওয়ার সাথে সাথে একটি যুগের সমাপ্তি হয়। এই কারখানাটি ছিল ইউরোপীয় শিল্পশক্তির গর্বের প্রতীক। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে, আমেরিকার সাউথ ক্যারোলাইনার স্পার্টানবার্গে সেই একই জার্মান জায়ান্ট বিএমডব্লিউ চালাচ্ছে তার বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকেন্দ্র — পূর্ণ উদ্যমে, বিরামহীনভাবে।
এই দুটি ছবি পাশাপাশি রাখলেই স্পষ্ট হয়ে যায় অর্থনীতির একটি বড় রহস্য, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে মাথা ঘামাচ্ছেন — একই বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও আমেরিকা কেন তার প্রতিযোগীদের চেয়ে এতটা এগিয়ে?
সংকটের পর সংকট, তবুও আমেরিকা টিকে আছে
গত কয়েক বছরে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো একের পর এক ধাক্কা সামলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বড় আকারের অভিবাসন বিতাড়ন শ্রমবাজারে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তেলের বাজারকে করেছে অস্থির।
অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ভেবেছিলেন এই চাপগুলো মিলে আমেরিকার অর্থনীতিকে নাস্তানাবুদ করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। অর্থনীতি ঠিকই বেড়েছে, স্থিরভাবে। মূল্যস্ফীতি মাঝেমধ্যে জেদি হয়েছে ঠিকই, তবে দুর্বল প্রবৃদ্ধি আর লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির যে বিপজ্জনক সমন্বয়ের আশঙ্কা ছিল, তা এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
আরএসএম-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস এই পরিস্থিতিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তার মতে, বাণিজ্য যুদ্ধ নিজেই আমেরিকার শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে উঠেছে। বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর হঠাৎ শুল্ক আরোপ হতেই মার্কিন কোম্পানিগুলো মুনাফা কমিয়ে মেনে নেয়নি পরিস্থিতি — বরং বিনিয়োগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা: আমেরিকার গোপন অস্ত্র
বর্তমানে মার্কিন মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩.৯ শতাংশ যাচ্ছে মূলধনী বিনিয়োগে বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচারে। সরবরাহ ও চাহিদার দ্বৈত চাপ সামলানোর মধ্যেও এই বিনিয়োগ কমেনি, বরং ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এটি স্বাভাবিক নয় — এটি অসাধারণ।
এই বিনিয়োগের ফলে উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন এসেছে, যা বাইরের চাপের একটি বড় অংশকে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মার্কিন অর্থনীতি বার্ষিক প্রায় ২ শতাংশ হারে প্রসারিত হচ্ছে।
তেলের অস্ত্র এখন আমেরিকার হাতে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তেলের দাম বাড়িয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটি আমেরিকার জন্য বড় বিপদের কারণ হতো। কিন্তু শেল বিপ্লব সেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
গত দুই দশকে আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। একই সাথে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত কমিয়ে এনেছে। ব্রুসুয়েলাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের গোড়া থেকে ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির বিকাশ এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার মিলিয়ে গত ৫০ বছরে প্রতি একক তেল ব্যবহারে মোট দেশজ উৎপাদনে তেলের অবদান অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ইউরোপের ছবিটা একদম আলাদা। মহাদেশটি বহু বছর ধরে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি আর আন্তঃসংযুক্ত সরবরাহ নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতেই সেই দুর্বলতা ভয়াবহভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনে সেই ঝুঁকি এখনও বহাল আছে।
ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি — আমেরিকা বনাম ইউরোপ
ব্রাসেলসের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুগেলের জ্যেষ্ঠ ফেলো রেবেকা ক্রিস্টি মনে করেন, এই বিভাজন শুধু নীতির পার্থক্য নয় — এটি মূলত সমস্যা সমাধানের মানসিকতার পার্থক্য।
মার্কিনরা অত্যন্ত সমাধানমুখী। স্বল্পমেয়াদী ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে তারা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ইউরোপ সংস্কৃতিগতভাবেই ঝুঁকিবিরোধী। এমনকি ইইউ-এর নিজস্ব আর্থিক সেবা কমিশনার একটি আলোচনায় স্বীকার করেছেন যে ইউরোপে ঝুঁকি না নেওয়ার বিপদ নিয়ে পর্যাপ্ত কথাই হয় না।
এই মানসিকতার পার্থক্য প্রতিফলিত হয় ব্যবসায়িক অর্থায়নেও। ইউরোপে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল, আর শ্রমিকদের পেনশন বাঁধা থাকে নিশ্চিত বীমা চুক্তিতে — যেখানে লাভ এবং ক্ষতি দুটোই সীমাবদ্ধ।
আমেরিকায় চিত্রটা ভিন্ন। এখানে কোম্পানিগুলো শেয়ার বাজার ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, উদ্যোক্তা পুঁজি বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল টানতে পারে। এই নমনীয়তাই মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ইউরোপীয় মডেলের তুলনায় অনেক এগিয়ে রাখে।
চকচকে সংখ্যার আড়ালে যন্ত্রণার ছবি
তবে এই সাফল্যের গল্পের একটি অন্ধকার দিকও আছে। বৃহৎ অর্থনৈতিক সাফল্য সমাজের নিচের স্তরের কষ্টকে আড়াল করতে পারে।
আমেরিকা চরম বৈষম্যের দেশ। যদি কেউ সত্যিই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে তার জন্য পথ অত্যন্ত কঠিন। শ্রমবাজার নতুন চাকরির স্তূপ তৈরি করছে না, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, আর অনেক শহরে আবাসন সংকট তীব্র হয়েছে।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো বৈষম্য এক সীমা পার করলে কী হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ডলারের আধিপত্য আর স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থাও সাহায্য করতে পারবে না, যদি বাস্তব অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংকট দেখা দেয়।
সংখ্যায় সংকটের আভাস
এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। মে মাসে মার্কিন নিয়োগদাতারা ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন, যা প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু একই সপ্তাহে আসা মূল্যস্ফীতির তথ্য উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে উঠেছে। মে মাসে ভোক্তামূল্য আগের বছরের তুলনায় ৪.২ শতাংশ বেড়েছে — যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিলে এই হার ছিল ৩.৮ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমেরিকার অর্থনৈতিক সহনশীলতারও একটি সীমা রয়েছে। উচ্চ জ্বালানিমূল্য, জেদি মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য — এই তিনটি শক্তি মিলিয়ে আমেরিকার বর্তমান সুবিধাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিতে পারে।
নোংরা জামার স্তূপে সবচেয়ে পরিষ্কারটি
এই সব হিসাব-নিকাশের পরেও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় আমেরিকাকে এখনও শক্তিশালী দেখাচ্ছে। নমনীয় বাজার, দ্রুত বিনিয়োগ, প্রচুর জ্বালানি সম্পদ আর ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি — এই চারটি স্তম্ভ মিলে আমেরিকাকে এমন ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করছে, যা তার সমপর্যায়ের দেশগুলো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
ব্রুসুয়েলাস যেভাবে বলেন, সেটিই হয়তো সবচেয়ে সৎ মূল্যায়ন — “এটি অত্যন্ত নোংরা একটি কাপড়ের স্তূপে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে পরিষ্কার জামা।”
পরিষ্কার, কিন্তু নিখুঁত নয়। শক্তিশালী, কিন্তু অজেয় নয়। আমেরিকার অর্থনীতির গল্পটা হয়তো এটুকুই।

