যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই আশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে চালানো ইসরাইলি হামলা। সাম্প্রতিক এই হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান এবং স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে যে, দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ গভর্নরেটে মঙ্গলবার একাধিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মাইফাদুন এলাকায় দুটি পৃথক গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। একই সময়ে শৌকিন গ্রামেও আরেকটি গাড়িতে আঘাত হানে ড্রোন। এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য ঘোষিত সমঝোতা স্মারককে ঘিরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আলোচনার পুরো সময়জুড়ে ইরান বারবার দাবি করে এসেছে যে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।
যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন যে সমঝোতার আওতায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে নতুন হামলাকে ঘিরে চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতি এবং হামলা চলতে থাকলে তা সমঝোতার চেতনার পরিপন্থী হবে। তার মতে, যুদ্ধ সত্যিকার অর্থে শেষ হয়েছে বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে না যায়।
শুধু কূটনৈতিক পর্যায়েই নয়, সামরিক ক্ষেত্র থেকেও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক সমন্বয় কেন্দ্র খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে ইসরাইলকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ওয়াশিংটন ইসরাইলকে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ করে।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের নিরাপত্তা অবস্থান বজায় থাকবে। এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইরান তাদের আশ্বস্ত করেছে যে ভবিষ্যৎ আলোচনা পর্বে লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও লেবানন প্রশ্নে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইসরাইল যদি সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে এবং ইরান এটিকে চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সদ্য শুরু হওয়া শান্তি প্রক্রিয়া নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ মার্চ নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৩ হাজার ৮২৬ জন নিহত এবং ১১ হাজার ৮৫১ জন আহত হয়েছেন। ফলে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক এবং অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

