ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির হাতে আসা একটি নথিতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই-এর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ‘গ্রক’ ব্যবহার করা হয়েছে।
নথিটি ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রযুক্তি, আইন এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
নথির তথ্যমতে, পনেরো জুনের ওই দলিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ দাবি করেছে, একটি বৃহৎ তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গ্যাস টারবাইন ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। ওই তথ্যকেন্দ্রটি বর্তমানে একটি পরিবেশগত মামলার মধ্যে রয়েছে। সেখানে বলা হয়, মামলাটি চলতে থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা জাতীয়, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই যুক্তির সমর্থনে পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ কর্মসূচিতে ‘গ্রক’ ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে এই ধরনের কর্মসূচিতে অন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলেও পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বিশেষ সামরিক অভিযানে অল্প সময়ের মধ্যে বহু লক্ষ্য শনাক্ত ও বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
নথিতে আরও দাবি করা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে সামরিক কার্যক্রমের গতি এবং কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এই তথ্য প্রকাশের পরই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, অনুমোদন ছাড়াই বৃহৎ পরিসরে গ্যাস টারবাইন ব্যবহার করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং এর ফলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে দূষণের মাত্রা বেড়েছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, এসব টারবাইন সাময়িকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এগুলো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থার অংশ নয়।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সামরিক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন দেখা যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রযুক্তি সামরিক ও নজরদারি কাজে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাত বিকল্প প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ভবিষ্যতে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার অংশ হয়ে উঠবে, নাকি এটি কেবল সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এই প্রশ্ন এখন বড় আকারে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং নৈতিকতার সীমারেখাকেও নতুনভাবে পরীক্ষা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি যত বাড়ছে, ততই এর ব্যবহার ঘিরে স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই দাবি সেই বিতর্ককেই আরও গভীর করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাতে পারে, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

