পূর্ব আফ্রিকায় নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘিরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া সতর্ক করেছেন, দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এই প্রাদুর্ভাব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা সংকটে পরিণত হতে পারে।
মঙ্গলবার বুরুন্ডিতে আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক দাতাদের ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি এই সতর্কতা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সংক্রমণ এমন গতিতে ছড়াচ্ছে, যা স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুসন্ধান ও চিকিৎসা সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে অন্তত ৮৩৭ জন সংক্রমিত হয়েছেন এবং ১৯৬ জন মারা গেছেন। পাশের দেশ উগান্ডায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন আক্রান্ত এবং দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাগুলো এখনো আগের বড় প্রাদুর্ভাবগুলোর তুলনায় কম মনে হতে পারে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ভয় অন্য জায়গায়—সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে থাকতে পারে।
জ্যঁ কাসেয়ার ভাষায়, এই প্রাদুর্ভাব দ্রুত থামানো না গেলে তা ২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং ২০১৮ সালের কঙ্গোর প্রাদুর্ভাবের চেয়েও খারাপ হতে পারে। ২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকার প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে কঙ্গোতে আরেক বড় প্রাদুর্ভাবে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
ইবোলা মূলত এক ধরনের ভাইরাসজনিত রক্তক্ষরণজনিত জ্বর, যা মারাত্মক আকার নিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুর পরও অত্যন্ত সংক্রামক থাকতে পারেন। ফলে চিকিৎসা, যত্ন এবং মৃতদেহ সৎকার—সব ক্ষেত্রেই কঠোর সতর্কতা দরকার হয়।
ইবোলার বড় প্রাদুর্ভাব ঘটাতে সক্ষম পরিচিত তিনটি ধরন হলো জাইর, সুদান এবং বুন্দিবুগিয়ো। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে বুন্দিবুগিয়ো ধরন। আগের পশ্চিম আফ্রিকা ও কঙ্গোর বড় প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে বেশি জড়িত ছিল জাইর ধরন। জাইর ও বুন্দিবুগিয়ো—দুই ধরনের ক্ষেত্রেই মৃত্যুহার বেশ বেশি, যা ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে হতে পারে।
এই জায়গাতেই বর্তমান সংকট আরও কঠিন হয়ে উঠছে। জাইর ধরনের বিরুদ্ধে টিকা ও পরীক্ষামূলক চিকিৎসা তৈরি হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের কঙ্গো প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মানুষ আক্রান্ত হলেও ৩ লাখের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছিল এবং অনুমোদিত চিকিৎসাও ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু বুন্দিবুগিয়ো ধরনের জন্য এখনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা নেই।
বুন্দিবুগিয়ো ধরন আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে পূর্ব কঙ্গোতে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হওয়ায় দীর্ঘদিন গবেষণা ও ওষুধ তৈরির অগ্রাধিকারে ছিল না। ফলে এখন স্বাস্থ্যকর্মীরা এমন এক ভাইরাসের মুখোমুখি, যার বিরুদ্ধে প্রস্তুত অস্ত্র খুব সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও সহায়ক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে পূর্ব কঙ্গোর চলমান সংঘাত। যে অঞ্চলে ভাইরাস ছড়াচ্ছে, সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র পক্ষের লড়াইয়ের কারণে বহু এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে আক্রান্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করতে পারছেন না এবং বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা বা শরণার্থী শিবিরে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইবোলা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো সংস্পর্শ অনুসন্ধান। অর্থাৎ, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কার কার সংস্পর্শে এসেছেন, কোথায় গেছেন, কাদের সংক্রমিত করতে পারেন—এসব দ্রুত খুঁজে বের করা। কিন্তু বর্তমান প্রাদুর্ভাবে এই ব্যবস্থাই সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। জ্যঁ কাসেয়া জানিয়েছেন, ২৬ হাজারের বেশি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; তারা কোথায় আছেন, অন্যদের সংক্রমিত করছেন কি না—কর্তৃপক্ষ তা জানে না।
এই তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ ইবোলা যত বেশি অদৃশ্যভাবে ছড়ায়, তত বেশি কঠিন হয়ে ওঠে তা নিয়ন্ত্রণ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মধ্য মে মাসে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার আগেই শত শত মানুষ আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এখনো অনেক অশনাক্ত রোগী সমাজের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সংক্রমণ ইতোমধ্যে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বাণিজ্যিক ইতুরি প্রদেশ থেকে উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভুতে ছড়িয়ে পড়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে উগান্ডাতেও রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্ত প্রদেশগুলোর নতুন নতুন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু শুধু চিকিৎসা বা ভৌগোলিক বাধাই নয়, সামাজিক অবিশ্বাসও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঙ্গোর অনেক এলাকায় ইবোলা নিয়ে নানা ধরনের ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, রোগটি আসল নয়; বরং সরকার অর্থ পাওয়ার জন্য এটিকে ব্যবহার করছে। আবার কেউ আক্রান্ত হওয়ার লজ্জা বা ভয় থেকে লক্ষণ প্রকাশ করতে চান না।
অনেক পরিবার তাদের মৃত স্বজনকে ঐতিহ্যগত রীতিতে দাফন করতে না পারায় ক্ষুব্ধ। ইবোলা আক্রান্ত মৃতদেহ অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় নিরাপদ দাফন পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি, কিন্তু এটি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে। জুনের শুরুতে ক্ষুব্ধ কিছু তরুণ তাদের মৃত আত্মীয়দের দাফনের জন্য সরিয়ে নিতে হাসপাতালে ঢুকে পড়ে এবং চিকিৎসা তাঁবু ও অন্যান্য অবকাঠামোতে আগুন দেয়। এই ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা কার্যক্রমকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি। ২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকা প্রাদুর্ভাবের সময় আন্তর্জাতিক দাতারা ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন থেকে ৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও লাইবেরিয়ায় চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এভারিস্ত ন্দায়িশিমিয়ে, যিনি বর্তমানে আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, জানিয়েছেন যে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ৫১৮ মিলিয়ন ডলারের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ এখন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা অনেক কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সহযোগিতার পরিবেশও এখন আগের মতো শক্তিশালী নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি সহায়তা কমিয়েছে এবং বিদেশে বহু স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে সহায়তা করা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় দাতারাও গত বছর সহায়তা কমিয়েছে। ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমন এক সময়ে চাপের মুখে পড়েছে, যখন দ্রুত অর্থ, সরঞ্জাম ও জনবল প্রয়োজন।
কঙ্গোর স্থানীয় প্রতিক্রিয়াও নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। আইসোলেশন কেন্দ্রের সংখ্যা কম, যা সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত চারজন স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন। এটি শুধু মানবিক ক্ষতি নয়, বরং প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত।
চিকিৎসা সংস্থা এমএসএফের কর্মকর্তা ট্রিশ নিউপোর্ট বলেছেন, ইবোলা মোকাবিলায় অর্থ অবশ্যই দরকার, কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ স্থানীয় মানুষের কাছে ইবোলা হয়তো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতো একমাত্র অগ্রাধিকার নয়। তারা একই সঙ্গে নিরাপত্তা, পানি, সাধারণ চিকিৎসা এবং জীবনযাপনের মৌলিক প্রয়োজন নিয়ে লড়ছে।
এই মন্তব্য বর্তমান সংকটের গভীরতা বোঝায়। ইবোলা শুধু একটি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি যুদ্ধ, দারিদ্র্য, অবিশ্বাস, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক সহায়তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে কেবল চিকিৎসা দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। সংক্রমণ থামাতে হলে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, নিরাপদ চিকিৎসা পৌঁছে দিতে হবে, দাফন পদ্ধতি নিয়ে সংবেদনশীলভাবে কাজ করতে হবে এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা যে কারণে এই প্রাদুর্ভাবকে সম্ভাব্য “সবচেয়ে ভয়াবহ” বলছেন, তা শুধু মৃত্যুহারের জন্য নয়। কারণ এখানে একসঙ্গে কয়েকটি বিপজ্জনক উপাদান কাজ করছে—অনুমোদিত টিকা নেই, কার্যকর চিকিৎসা সীমিত, সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে, হাজার হাজার সংস্পর্শ অশনাক্ত, সংঘাত চলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কম।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কত দ্রুত এগিয়ে আসে। যদি অর্থায়ন, সরঞ্জাম, নিরাপদ প্রবেশাধিকার এবং স্থানীয় আস্থা তৈরির কাজ দ্রুত না হয়, তাহলে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আর যদি তা ঘটে, তবে পূর্ব আফ্রিকার এই সংকট শুধু স্থানীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয় থাকবে না; এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়াবে।

