বিদেশে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকার বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আটকে রয়েছে, যা ইরানের জন্য একদিকে বড় অর্থনৈতিক চাপ আবার অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
এই অর্থের বড় অংশ এসেছে মূলত তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক আর্থিক বিচ্ছিন্নতা এবং ডলারভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সরাসরি তেহরানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক চাপেরও একটি অংশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর মধ্যেই বহু দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই অর্থ আটকে রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বড় অংশটি রয়েছে চীনে। ধারণা করা হয়, সেখানে ইরানের প্রায় ২ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ আটকে থাকতে পারে। এই অর্থ মূলত দীর্ঘদিন ধরে তেল বিক্রির মাধ্যমে জমা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চীন ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা হওয়ায় এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জটিল আকার নিয়েছে।
চীনের পাশাপাশি ইরাকেও বড় অঙ্কের অর্থ আটকে আছে। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ইরাকের ব্যাংক ব্যবস্থায় রয়েছে, যা বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অর্থ সরাসরি স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াও এই তালিকায় রয়েছে। দুই দেশেই প্রায় ৭০০ কোটি ডলার করে আটকে থাকার কথা বলা হচ্ছে। ২০১৮ সালের আগে ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা ছিল এই দেশগুলো, যার কারণে অর্থ স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা হয়ে যায় এবং পরে নিষেধাজ্ঞার কারণে তা আটকে থাকে।
এছাড়া ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়েছিল মানবিক ব্যবহারের শর্তে। তবে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় এই অর্থ ব্যবহারের নিয়ম আরও কঠোর করা হয়।
কিছু অর্থ জাপান, ওমান, লুক্সেমবার্গসহ অন্যান্য দেশেও ছোট আকারে আটকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এটি মূলত দেখায় যে ইরানের অর্থনৈতিক লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ আটকে থাকার প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা। তেল বিক্রির অর্থ ডলারভিত্তিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করতে না পারায় বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে তা জমা হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় রাখা হলেও তা সহজে ইরানে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না।
বর্তমান আলোচনায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার আলোচনা চলার সময় এই অর্থ ফেরত দেওয়া একটি বড় দাবি হিসেবে সামনে এসেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইরান অন্তত ৬০০ কোটি থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার তাৎক্ষণিকভাবে ছাড়ের দাবি জানাচ্ছে, আর বৃহত্তর পরিসরে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার মুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এই অর্থ ফেরত পেলে তা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। মুদ্রার স্থিতিশীলতা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সব মিলিয়ে, বিদেশে আটকে থাকা এই বিশাল অর্থ এখন শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে, যার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আসন্ন সমঝোতার গতিপথের ওপর।

