মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শান্তির কথা বহুবার বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেই শান্তির পথ বারবার আটকে গেছে শক্তির রাজনীতি, দখলদারি মনোভাব এবং একতরফা সমর্থনের কারণে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে এমন মাত্রায় রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছে, যার ফলে ইসরায়েল নিজেকে প্রায় জবাবদিহির বাইরে ভাবতে শুরু করেছে। এখন যখন ওয়াশিংটন নিজেই আঞ্চলিক শান্তি ধরে রাখতে চায়, তখন দেখা যাচ্ছে—যে আগ্রাসী শক্তিকে এতদিন উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, সেটিকেই আর সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। সিরিয়ার সঙ্গেও আরেকটি বড় চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এসব প্রচেষ্টা এসেছিল দীর্ঘ যুদ্ধ ও সংঘাতের পর। ১৯৫৬ সালের ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন, ১৯৬৭ সালের নাকসা, অক্টোবর ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ, ১৯৭৮ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং ১৯৮২ সালে বৈরুত আক্রমণ—এসব রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর শান্তির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে প্রকৃত শান্তির পথে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। বরং ইসরায়েলকে এমন এক আঞ্চলিক আধিপত্যের পথে এগোতে সহায়তা করেছে, যেখানে শক্তিই প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে। এর ফল এখন ওয়াশিংটনের কাছেই ফিরে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো শান্তি চুক্তি করতে চায়, তখন ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থান সেই প্রচেষ্টাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিরাপত্তা উদ্বেগ সবসময় বড় ভূমিকা রেখেছে। যারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে তুলেছিলেন, তাদের অনেকেই এমন এক ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের প্রকল্প চালাচ্ছিলেন, যেখানে অধিকাংশ মানুষ ছিল আরব এবং অঞ্চলটি ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রভাবের মধ্যে ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই ইসরায়েলের ভেতরে দুটি ভিন্ন পথ তৈরি হয়।
প্রথম পথ ছিল শক্তি, দেয়াল, সামরিক আধিপত্য এবং ভয় প্রদর্শনের পথ। এই ধারণার সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যা দেন জেভ জাবোটিনস্কি, যিনি ফিলিস্তিনে ইরগুন নামের সশস্ত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯২৩ সালে লেখা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধে তিনি যুক্তি দেন, স্থানীয় জনগণের সম্মতি ছাড়াই জায়নবাদী বসতি প্রকল্প এগোতে হলে এমন এক শক্তিশালী দেয়ালের আড়ালে তা করতে হবে, যা স্থানীয়রা ভাঙতে পারবে না।
ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন–গুরিয়নও বিশ্বাস করতেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা শক্তির মাধ্যমে বদলাতে হবে। কয়েক দশক পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৯৯৩ সালের বইয়ে একই ধরনের ভাবনা তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসরায়েল যদি সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে না পারে, তবে তার টিকে থাকা কঠিন হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সেই নীতিরই অনুসরণ করেছেন, যার ফল হয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিরতা।
দ্বিতীয় পথটি তৈরি হয় অক্টোবর ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর। সেই যুদ্ধ ইসরায়েলকে বুঝিয়ে দেয়, শুধু শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা টেকসই হয় না। তখন “শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব” ভাবনার উত্থান ঘটে। এই ধারণার মূল কথা ছিল, ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একীভূত হতে হবে।
এই পথের সমর্থকেরা “ভূমির বিনিময়ে শান্তি” নীতিকে গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিয়ে ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতি ও শান্তি পাবে। এই নীতির ফলও পাওয়া যায়। ১৯৭৮ সালে মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সিনাই উপদ্বীপ মিসরের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিও একই ধারার অংশ ছিল। ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার সঙ্গে অসলো চুক্তিও এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই পড়েছিল।
ইসহাক রবিনের নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলি সরকার সিরিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিনিময়ে দখলকৃত গোলান মালভূমি পুরোপুরি ফেরত দিতেও প্রস্তুত ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের শেষ দিকে জায়নবাদী উগ্রপন্থীদের হাতে রবিন নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন নেতার মৃত্যু ছিল না; তা ইসরায়েলের শান্তিমুখী সম্ভাবনাকেও বড় আঘাত করে।
এরপর থেকে ইসরায়েল ধীরে ধীরে আবারও শক্তির দেয়ালের পথে ফিরে যায়। বর্তমান সময়ে সেই পথ আরও কঠোর, আরও আগ্রাসী এবং আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলের এই আগ্রাসী প্রত্যাবর্তনের জবাবে আরব রাষ্ট্রগুলো একই মাত্রার যুদ্ধংদেহী অবস্থান নেয়নি। বরং ২০০২ সালে আরব বিশ্ব বৈরুত আরব শান্তি উদ্যোগ উপস্থাপন করে। সেই উদ্যোগেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রস্তাব ছিল, গোলান মালভূমি ও ১৯৬৭ সালে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ফেরত দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে শান্তি। কিন্তু ইসরায়েল এই উদ্যোগকে কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেনি।
ইসরায়েলের আগ্রাসী পথে ফিরে যাওয়ার পেছনে শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দায়ী নয়। যুক্তরাষ্ট্রও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ওয়াশিংটন ইসরায়েলের আচরণের ওপর কার্যকর কোনো সীমা আরোপ করেনি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য রাষ্ট্রগুলোর বৈধ নিরাপত্তা স্বার্থ যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর ইসরায়েলের স্বার্থই একমাত্র বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর্থিক সহায়তা, কূটনৈতিক সুরক্ষা, সামরিক সমর্থন কিংবা দখলকৃত ভূখণ্ডের স্বীকৃতি—এসবের বাইরে গিয়ে তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ট্রাম্প আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশে সরিয়ে দিতে চান। এই চুক্তিগুলো কার্যত “ভূমির বিনিময়ে শান্তি” নীতিকে দুর্বল করে। এর জায়গায় এমন এক ধারণা সামনে আনা হয়, যেখানে শান্তির অর্থ হয়ে দাঁড়ায়—যুদ্ধ, ধ্বংস বা হত্যা থেকে বাঁচতে হলে ইসরায়েলের শর্ত মেনে নিতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে প্রায় অবাধ চলার সুযোগ দিয়েছে। গত বছর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী ছয়টি আরব দেশে হামলা চালায়। এর মধ্যে কাতারও ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর ছিল। এমন ঘটনা দেখায়, ইসরায়েলের আগ্রাসন শুধু শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের ভূখণ্ডেও পৌঁছে গেছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, যা মূলত ইসরায়েলের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়েছে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আরব মিত্রদের নিরাপত্তা হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তবু ওয়াশিংটন এমন পথে হাঁটে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয় ইসরায়েল।
এই নীতির ফলে আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রান্তিক করে ফেলা হয়েছে। অথচ নিজেদের অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদেরও পূর্ণ অধিকার আছে। বহু আরব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের এমন এক আঞ্চলিক পুনর্গঠনের খরচ বহন করতে বলা হচ্ছে, যা তাদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতার চেয়ে নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বেশি মানানসই।
শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভাষায় মোড়ানো এই সামরিক বিশৃঙ্খলা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনো ইতিবাচক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হয়েছেন, সেটি মানতে ইসরায়েলের অনীহা দেখিয়ে দেয়—নিয়ন্ত্রণহীন আগ্রাসনকে দীর্ঘদিন ছাড় দিলে শেষ পর্যন্ত তা মিত্রের কথাও মানে না।
আলোচনার পুরো সময়জুড়ে ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে বৈরিতা শেষ করার প্রচেষ্টা দুর্বল করেছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোনে যত কঠোর ভাষাই ব্যবহার করুন বা বিবৃতিতে যত সতর্কবার্তাই দিন, বাস্তবে ইসরায়েল তার সামরিক পথ ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বোঝা প্রয়োজন—মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত শান্তি চাইলে ইসরায়েল নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। আব্রাহাম চুক্তির মতো আধিপত্যমূলক ব্যবস্থাকে শান্তিচুক্তি হিসেবে তুলে ধরলে তা অঞ্চলের গভীর সংকট মেটাবে না। বরং ভবিষ্যৎ সংঘাতের ভিত্তি আরও পোক্ত করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ ইসরায়েলকে তার বর্তমান সম্প্রসারণবাদী রূপে মেনে নেবে না। যতই আব্রাহাম চুক্তিকে প্রচার করা হোক, জনমত অন্য বাস্তবতা দেখায়। আরব জনমত সূচক ২০২৫ জরিপে দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধী। একই জরিপে ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন।
এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রীয় চুক্তি কাগজে তৈরি হতে পারে, কিন্তু আঞ্চলিক বৈধতা আসে জনগণের গ্রহণযোগ্যতা থেকে। জনগণের মনস্তত্ত্ব, ঐতিহাসিক ক্ষোভ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি তৈরি করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ইসরায়েলের এই আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী রূপকে সমর্থন করবে, তত বেশি মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের আস্থা হারাবে। ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে অঞ্চলের নিরাপত্তা হিসাব ও ভূরাজনৈতিক চিন্তাকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিচ্ছে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ওয়াশিংটন যদি একই নীতি ধরে রাখে, তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে তার প্রভাব আরও কমে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ আছে। প্রথমত, ইসরায়েলকে চাপ দিয়ে তাকে “শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব” নীতিতে ফিরিয়ে আনা, যার কেন্দ্রে থাকবে ফিলিস্তিন প্রশ্নের ন্যায়সঙ্গত সমাধান। দ্বিতীয়ত, যদি ইসরায়েল সেই পথে ফিরতে না চায়, তবে তার আগ্রাসী অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেকে আলাদা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায্যতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, দখলদারির অবসান এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নের বাস্তব সমাধান। ইসরায়েলকে লাগামহীন রেখে, আর তার প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন দিয়ে, কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে না। বরং সেই নীতিই নতুন যুদ্ধ, নতুন ক্ষোভ এবং নতুন অস্থিরতার জন্ম দেবে।

