সুইজারল্যান্ডের শান্ত পাহাড়ি পরিবেশে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শেষ হলেও এর রাজনৈতিক উত্তাপ এখনো কমেনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি, লেবাননে সংঘাত, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে এই বৈঠক ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কূটনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান যে ভূমিকা নিয়েছে, তা এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তাদের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে। আপাতত এটিকে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বলা যাচ্ছে না; বরং বলা যায়, দীর্ঘদিনের শত্রুতা ও অবিশ্বাসের মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রিত পথ খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
আলোচনার স্থান ছিল সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য রিসোর্ট বুর্গেনস্টক। এই জায়গাটি কূটনৈতিক বৈঠকের জন্য পরিচিত হলেও এবার আলোচনার পরিবেশ ছিল একেবারেই স্বাভাবিক নয়। বৈঠকের আগে থেকেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছিল। ইরান অভিযোগ করছিল, লেবাননে যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করতে পারেনি। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছিল, তেহরান পরিস্থিতিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আলোচনায় মার্কিন পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইরানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আলোচনার আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির করমর্দনের ছবি প্রকাশিত হয়। সেখানে জে ডি ভ্যান্স ও জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতিও দেখা যায়। ছবিটি শুধু সৌজন্য বিনিময়ের দৃশ্য ছিল না; বরং তা বোঝাচ্ছিল, এই আলোচনার পরিধি কেবল দুই দেশের সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে আটকে নেই।
কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক পর্যায়ে একটি কাঠামোগত বোঝাপড়া হলেও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিষয়গুলো এখনো বিশেষজ্ঞদের আলোচনার ওপর নির্ভর করছে। এই পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ, পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আরও খুঁটিনাটি আলোচনা হওয়ার কথা।
এই বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, দুই পক্ষ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে রাজি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী। সেখানে কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক চাপ পড়ে।
গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে সেটিই দেখা গেছে। শিপিং অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র পাঁচটি জাহাজ ওই প্রণালি পার হয়, যেখানে আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ২৬। তবে যেসব জাহাজ জিপিএস বন্ধ রেখে চলাচল করে, সেগুলো এই হিসাবে ধরা পড়েনি। তবু সংখ্যার এই বড় পার্থক্য বাজারে উদ্বেগ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।
ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সি এক সামরিক সূত্রের বরাতে জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইরানের এই পদক্ষেপের বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের তথ্য দেখাচ্ছে, পরিস্থিতির প্রভাব একেবারে অস্বীকার করার মতো ছিল না।
আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল লেবানন। কাতার ও পাকিস্তানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ লেবাননে সংঘাত থামানোর একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। ইরান দাবি করছে, লেবাননে যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় তারা হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে, যদিও তা পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
জে ডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, লেবাননের মতো বিষয়গুলো সবসময় কিছুটা জটিল ও অগোছালো হয়। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দিতে চায়নি। বরং হরমুজ, লেবানন ও পারমাণবিক ইস্যুকে একই কাঠামোর মধ্যে রেখে একটি অস্থায়ী স্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করেছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ছিল অনেক বেশি কঠোর। রোববার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ফক্স নিউজ জানায়, ট্রাম্প ইরানের কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করে, তাহলে সে দেশের অস্তিত্ব থাকবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারে এবং সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজস্ব কর বা টোল বসাতে পারে।
এই ধরনের ভাষা আলোচনার পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক সূত্রের বরাতে জানায়, ট্রাম্পের হুমকির খবর প্রকাশের পর ইরানি প্রতিনিধিরা আর আলোচনার কক্ষে ফিরতে রাজি হননি। তবে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান–প্রদান চলতে থাকে। অন্যদিকে একজন মার্কিন কূটনীতিক এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ইরানি পক্ষের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে হরমুজ প্রণালি, লেবানন, পারমাণবিক ইস্যু ও সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এখানেই বোঝা যায়, দুই পক্ষ একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে তুলে ধরছে। ইরান দেখাতে চাইছে, তারা চাপের মুখে আলোচনায় বসেনি। যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চাইছে, আলোচনা ভেঙে পড়েনি এবং বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। কূটনীতিতে এই ধরনের দ্বৈত বর্ণনা নতুন নয়। অনেক সময় পক্ষগুলো নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দর্শকদের সামনে কঠোর অবস্থান দেখায়, কিন্তু পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তেহরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়, বিদেশে আটকে থাকা কিছু সম্পদ ছাড় এবং ইরানের জন্য পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে নিশ্চয়তা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। তার এই বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। তাই অর্থনৈতিক ছাড়কে তেহরান আলোচনার বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
তবে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের অবস্থান এখনো সতর্ক। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিষয়ে কোনো আলোচনা শুরুর আগে পুরনো চুক্তির শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ফেরত দেওয়া এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার—এই দুই বিষয়কে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকুক, লেবাননে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আসুক এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হোক। ফলে দুই পক্ষের লক্ষ্য একই নয়, কিন্তু উভয়েরই কিছু জরুরি প্রয়োজন আছে। ইরানের দরকার অর্থনৈতিক ছাড় ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের দরকার জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সংঘাত কমানো এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনা।
এই আলোচনার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো জ্বালানি বাজার। ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই চাপ এড়াতেই তিনি গত সপ্তাহের সমঝোতা স্মারকে রাজি হন। অর্থাৎ সামরিক ভাষা যতই কঠোর হোক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে রেখেছে।
লেবাননের পরিস্থিতিতেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন পর গত রোববার লেবাননে তুলনামূলক শান্ত দিন কাটে। দুই দিনের টানা ইসরায়েলি হামলা ও হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণের পর রোববার রাত পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। গত মার্চে ইসরায়েলি হামলার পর থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। সমঝোতার পর দক্ষিণ লেবাননের রাস্তায় ঘরে ফেরা মানুষের ভিড় দেখা যায়। মহাসড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, অনেককে হিজবুল্লাহর পতাকা হাতে আনন্দ করতেও দেখা যায়।
তবে এই শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ লেবানন ইস্যুতে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়; ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল যদি হামলা অব্যাহত রাখে, ইরান আবার হরমুজ প্রণালিকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আর হরমুজে নতুন অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি তেলের বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে পড়বে।
সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠক তাই একদিকে আশার, অন্যদিকে সতর্কতার। আশার কারণ হলো, তীব্র হুমকি ও পাল্টা হুমকির মধ্যেও দুই পক্ষ আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তারা ৬০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে, কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের জন্য সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলেছে।
সতর্কতার কারণ হলো, মূল সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের সম্পদ, লেবাননে যুদ্ধ, হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং ইসরায়েলের হামলা—এসব প্রশ্নের কোনোটিরই চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বরং বলা যায়, পক্ষগুলো আপাতত সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে।
এই আলোচনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কিন্তু কেউই দুর্বল দেখাতেও রাজি নয়। তাই প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা, আর পর্দার আড়ালে দরকষাকষি—এই দুই পথ একসঙ্গে চলছে।
আগামী ৬০ দিন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে যদি কারিগরি আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে একটি সীমিত কিন্তু কার্যকর চুক্তির পথ তৈরি হতে পারে। আর যদি লেবাননে সংঘাত আবার বেড়ে যায় বা হরমুজ প্রণালিতে নতুন বাধা তৈরি হয়, তাহলে সুইজারল্যান্ডের আলোচনার অর্জন দ্রুত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, সুইজারল্যান্ডের বৈঠক কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়; তবে এটি সংঘাতের কিনারা থেকে ফিরে আসার একটি সম্ভাব্য সেতু। এখন প্রশ্ন হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সেই সেতু পার হবে, নাকি আবার হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার পুরোনো পথে ফিরে যাবে।

