মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মুক্তবাজার, ব্যক্তিমালিকানা, প্রতিযোগিতা এবং আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির বড় ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করবে উদ্ভাবন, দক্ষতা, পণ্যের মান এবং গ্রাহকের আস্থার ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা সেই প্রচলিত মার্কিন পুঁজিবাদের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। এখানে বাজারের নিয়মের চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, সরকারি চাপ এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা বা কিউবার মতো হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তাঁর নিজের অর্থনৈতিক আচরণই এমন এক দিকের ইঙ্গিত দেয়, যা মুক্ত উদ্যোগ ও নিয়মভিত্তিক পুঁজিবাদের বিপরীত। যে রিপাবলিকান দল একসময় মুক্তবাজার, সীমিত সরকার এবং ব্যক্তিখাতের স্বাধীনতার কথা বলত, সেই দল এখন এমন এক রাষ্ট্রীয় প্রভাবভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নীরবে মেনে নিচ্ছে, যেখানে ব্যবসা ও ক্ষমতার সম্পর্ক ক্রমেই অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে।
মার্কিন ধাঁচের পুঁজিবাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন মালিকানা। সরকার আইন করবে, বাজারের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে, প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রণ আনবে—কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সুবিধা বা চাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে না। অন্যদিকে রাশিয়া বা চীনের মতো ব্যবস্থায় অনেক সময় দেখা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের ওপর রাষ্ট্রের গভীর প্রভাব থাকে। অনেক ব্যবসায়ী বুঝে যান, সরকারের সঙ্গে সংঘাতে গেলে তাঁদের ব্যবসা, সম্পদ বা অবস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই পথের কিছু লক্ষণ দেখাচ্ছে।
শিল্পনীতি বা সরকারি হস্তক্ষেপ সবসময় খারাপ নয়। কোনো নতুন শিল্পকে এগিয়ে নিতে, জনস্বার্থ রক্ষা করতে বা বাজারের ব্যর্থতা সামলাতে সরকার ভূমিকা রাখতেই পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ এই প্রযুক্তি শুধু ব্যবসার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, তথ্যনিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সরকারি হস্তক্ষেপ স্বচ্ছ নিয়মের বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দরকষাকষি, চাপ, রাজনৈতিক পক্ষপাত বা গোপন সমঝোতার মাধ্যমে চলে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআইসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন আলোচনা চলছে, যার ফলে তারা সরকারের কাছে অংশীদারি দিতে পারে। বিষয়টি ‘স্বেচ্ছায়’ ঘটছে বলে দেখানো হলেও প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র যখন কোনো দ্রুতবর্ধনশীল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন সেই স্বেচ্ছা আসলে কতটা স্বাধীন থাকে? রাষ্ট্রীয় প্রভাবের সামনে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সরাসরি বিরোধিতার ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে আনুগত্য ও সমঝোতাই নিরাপদ পথ হয়ে ওঠে।
এই ধরণের ব্যবস্থা নতুন নয়। রাশিয়ায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বহুদিন ধরেই রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন বুঝে এসেছেন। চীনে আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা নিয়ন্ত্রকদের সমালোচনা করার পর যে চাপের মুখে পড়েছিলেন, সেটিও ব্যবসা ও রাষ্ট্রের টানাপোড়েনের বড় উদাহরণ। সৌদি আরবে ২০১৭-১৮ সালে রিয়াদের রিটজ-কার্লটনে ধনী ব্যক্তিদের আটকে রেখে সম্পদ হস্তান্তরের ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন অস্বচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন ব্যবসায়িক স্বাধীনতা কত দ্রুত সংকুচিত হতে পারে।
ট্রাম্প হয়তো পুতিন বা শি জিনপিংয়ের মতো একই মাত্রার কঠোরতা দেখাচ্ছেন না, কিন্তু তাঁর পদ্ধতির মূল চরিত্রে মিল রয়েছে। তাঁর প্রশাসন প্রথমে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি বাধা বা প্রশাসনিক চাপে ফেলে, তারপর নতুন আলোচনার দরজা খুলে। এই আলোচনার লক্ষ্য যদি জনস্বার্থ রক্ষা হতো, তাহলে তা স্বচ্ছ নিয়ম, স্বাধীন তদারকি এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানে বারবার মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা চলছে।
গত আগস্টে এনভিডিয়া ও এএমডির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। চীনে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের বিক্রির ১৫ শতাংশ অংশ দাবি করে। যদি নিষেধাজ্ঞার কারণ সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তা হয়, তাহলে অর্থের বিনিময়ে সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা কীভাবে যুক্তিযুক্ত হয়? এর অর্থ দাঁড়ায়, নিরাপত্তা নীতিকেও রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে। এর দুই সপ্তাহের কম সময় পর ইন্টেল সরকারকে ১০ শতাংশ অংশীদারি দেয়, যদিও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সহায়তা আগে থেকেই ২০২২ সালের চিপস ও বিজ্ঞান আইনের অধীনে পাওয়ার কথা ছিল।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, সরকার আসলে কী চাইছে? যদি লক্ষ্য হয় প্রযুক্তির সুফল জনগণের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া, তাহলে স্বচ্ছ করনীতি, মুনাফার ওপর ন্যায্য কর, শ্রমিকের অধিকার, প্রতিযোগিতা আইন এবং জনস্বার্থভিত্তিক বিনিয়োগই সঠিক পথ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কর্পোরেট কর শক্তিশালী করার পথে না গিয়ে বরং বেছে বেছে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমঝোতায় যাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে কর্পোরেট মুনাফার ওপর কর থেকে যে রাজস্ব পাওয়া যেত, তা মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৬ শতাংশের সমান ছিল। আজ সেই আয় প্রায় অর্ধেক, যদিও কর্পোরেট মুনাফার অংশ অনেক বেড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের বদলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বড় ব্যবসাগোষ্ঠীই বেশি সুবিধা পায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একই দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের দাবি বাড়ছে। কিন্তু প্রশাসনিক নির্দেশে এমন ভাষা রাখা হয়েছে, যাতে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স, পূর্বানুমোদন বা অনুমতির মতো শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরি না হয়। অর্থাৎ বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও ভেতরে বড় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা স্পষ্ট। এতে জনস্বার্থের বদলে প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা পাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
এই ধরণের পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় গণতন্ত্রের। কারণ গণতন্ত্রে নীতি হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থে, খোলা আলোচনার ভিত্তিতে এবং আইনের অধীনে। কিন্তু যখন নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, বড় দাতা বা ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি প্রভাব ফেলে, তখন গণতন্ত্র ধীরে ধীরে অলিগার্কির দিকে সরে যায়। তখন সিদ্ধান্ত নেয় জনগণ নয়, বরং ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত সীমিত একটি গোষ্ঠী।
অর্থনীতির ক্ষতিও কম নয়। আধুনিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার। আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন আদালত এবং প্রতিযোগিতার ন্যায্য পরিবেশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কোনো উদ্যোক্তা যদি জানেন যে ভালো পণ্য বানানোর চেয়ে ক্ষমতাবানদের খুশি করা বেশি জরুরি, তাহলে উদ্ভাবন কমে যায়। দক্ষতার বদলে আনুগত্য পুরস্কৃত হয়। বাজার তখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সুবিধা বণ্টনের মঞ্চ।
ট্রাম্পের পদ্ধতিতে তাই সবচেয়ে সফল প্রতিষ্ঠান সেই নয়, যারা সবচেয়ে ভালো পণ্য তৈরি করছে বা সবচেয়ে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি আনছে। বরং সফল হতে পারে তারা, যারা ক্ষমতার ভাষা ভালো বোঝে, সময়মতো প্রশংসা করতে জানে এবং রাজনৈতিক দরবারে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। এটি মুক্তবাজারের মূল নীতির বিপরীত। এমন অর্থনীতিতে সাধারণ নাগরিক, ছোট উদ্যোক্তা, স্বাধীন উদ্ভাবক এবং ভোক্তারা ক্রমে পিছিয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব আছে নতুন শিল্পকে সহায়তা করার। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কঠোর জনস্বার্থভিত্তিক তদারকিও দরকার। কিন্তু সেই তদারকি হতে হবে নিয়মভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে। সরকার যদি ব্যক্তিগত দরকষাকষির মাধ্যমে অংশীদারি নেয়, কারও ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরে ছাড় আদায় করে, অথবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়, তাহলে সেটি শিল্পনীতি নয়; সেটি স্বজনতান্ত্রিক ক্ষমতার অর্থনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে, উদ্ভাবনের পরিবেশ নষ্ট করবে, জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যে দেশ একসময় নিয়মভিত্তিক বাজার অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরত, সেই দেশ যদি রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক পুঁজিবাদের দিকে এগোয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি গভীর হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্প বা কোনো এক প্রশাসনের নয়। প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাদ কি নিয়ম, ন্যায়, প্রতিযোগিতা ও জনস্বার্থের ওপর দাঁড়াবে, নাকি ক্ষমতার কাছে নত হওয়া ব্যবসায়ীদের পুরস্কৃত করবে? যদি দ্বিতীয় পথটি শক্তিশালী হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হয়তো সাময়িকভাবে কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা দেখাবে, কিন্তু গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের আস্থা হারাবে। আর সেই ক্ষতি কোনো শতাংশ, কর ছাড় বা সরকারি অংশীদারির হিসাব দিয়ে পূরণ করা যাবে না।

