মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতকে ঘিরে নতুন এক বিতর্কিত দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে চীন, রাশিয়া ও তুরস্ক চাইলে ইরানের পক্ষে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারত। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তিনি সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেন।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না; এটি আরও বিস্তৃত আকার নেওয়ার ঝুঁকিও বহন করছিল। তার মতে, বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র যদি সরাসরি পক্ষ বেছে নিত, তাহলে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারত।
ট্রাম্প বিশেষভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তুরস্ক ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম এবং আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে ইসরায়েলের সমালোচক হিসেবেও পরিচিত। সেই কারণে তুরস্ক চাইলে সংঘাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারত। তবে তার দাবি, ব্যক্তিগতভাবে এরদোয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি তাকে সংঘাত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান এবং তুর্কি নেতা সেই অবস্থান বজায় রাখেন।
চীনের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। এ কারণে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে চীনের ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারত। তবু বেইজিং সরাসরি সামরিক পথে না গিয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, চীনের এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হয়েছে।
রাশিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মস্কোর ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও রাশিয়া সরাসরি সামরিকভাবে জড়ায়নি। ট্রাম্পের মতে, এটি ছিল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তিনি মন্তব্য করেন যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সে সময় অন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়েও ব্যস্ত ছিলেন।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা প্রয়োজন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলাকালে চীন, রাশিয়া ও তুরস্ক বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক বিবৃতি দিলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ফলে তারা বাস্তবেই যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
তারপরও ট্রাম্পের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু আঞ্চলিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সামরিক জোট এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে এই অঞ্চলের যেকোনো বড় সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বদলে কূটনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কূটনৈতিক অঙ্গনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের দাবি কতটা বাস্তব এবং কতটা রাজনৈতিক বক্তব্য—তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থান এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

