মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হওয়ার আলোচনায় ছিলেন ইলন মাস্ক। প্রযুক্তি খাতের উত্থান, মহাকাশ শিল্পে বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাস এবং তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে তিনি নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের শেয়ারবাজার পতনের ফলে আবারও এক ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে তার সম্পদের পরিমাণ।
সাম্প্রতিক বাজার তথ্য অনুযায়ী, মাস্কের মোট সম্পদের মূল্য এখন ৯৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেই তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই শত শত বিলিয়ন ডলার মূল্য হারিয়েছে তার সম্পদ।
এই পতনের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রযুক্তি খাতজুড়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন উদ্বেগকে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ লাভজনকতা নিয়ে বাজারে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে প্রায় সব বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে শেয়ার বিক্রি শুরু করায় বাজারে ব্যাপক দরপতন দেখা দেয়।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ওপর। গত ১২ জুন প্রতিষ্ঠানটির বহুল আলোচিত শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরু হয়। শুরুতেই বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। সেই সময় স্পেসএক্সের প্রায় ৪২ শতাংশ মালিকানা থাকার কারণে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদও এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহে স্পেসএক্সের শেয়ার আরও বাড়তে থাকে। ১৬ জুন মাস্কের সম্পদ সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। তখন অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রযুক্তি খাতে বিক্রির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পেসএক্সের শেয়ারও দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। মধ্য জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে শেয়ারের মূল্য ৩০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এর সঙ্গে টেসলার শেয়ারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২২ জুন। ওই একদিনেই স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্য প্রায় ১৬ শতাংশ কমে যায়। এর ফলে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আনুমানিক ২৪০ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে টেসলার শেয়ারের মূল্য প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
তবে সম্পদের এই বড় পতনের পরও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন ইলন মাস্ক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এখনও তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা প্রযুক্তি খাতের বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পদের বড় অংশই শেয়ারমূল্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে সামান্য উত্থান বা পতনও বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তিদের সম্পদে শত শত বিলিয়ন ডলারের পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
অন্যদিকে আশাবাদী বিশ্লেষকদের ধারণা, মাস্কের জন্য ট্রিলিয়নিয়ার ক্লাবে ফিরে যাওয়া খুব কঠিন হবে না। কারণ স্পেসএক্সের শেয়ার যদি আবার সামান্য ঘুরে দাঁড়ায় এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, তাহলে তার সম্পদের মূল্য আবারও এক ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে।
সেই অর্থে ইলন মাস্কের জন্য এটি হয়তো কোনো সমাপ্তি নয়, বরং বাজারের ওঠানামার আরেকটি অধ্যায়। বিশ্বের প্রযুক্তি শিল্প, মহাকাশ খাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ যেদিকে যাবে, তার ব্যক্তিগত সম্পদের গতিপথও অনেকটাই সেদিকেই নির্ধারিত হবে।

