উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি, বহিরাগত মিত্রতা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাত, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এই পুরোনো ধারণাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শুধু অস্ত্র কেনা, বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করা বা নিজস্ব সেনাবাহিনী শক্তিশালী করলেই কি স্থায়ী নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি এত সহজ নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নিরাপত্তা কি শুধু সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে, নাকি এর জন্য দরকার গভীর অর্থনৈতিক সংযোগ? বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের সম্ভাবনা কমাতে হলে শুধু শত্রুকে ভয় দেখানো যথেষ্ট নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে সংঘাত শুরু করা নিজেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সম্পর্ক বহু বছর ধরে সন্দেহ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কৌশলগত অবিশ্বাসে ভরা। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা বলছে, এই দেশগুলো একে অপরকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে পারে না। জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথ, বন্দর, আর্থিক প্রবাহ, শ্রমবাজার, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা—সবকিছুতেই তাদের স্বার্থ কোনো না কোনোভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তাই নিরাপত্তার নতুন কাঠামো যদি সত্যিই কার্যকর করতে হয়, তাহলে ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও বাস্তববাদী অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে এগোতে হবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পুরোনো নিরাপত্তা ধারণা মূলত বাইরে থেকে আমদানি করা সুরক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তেল ও পুঁজি বিনিময়ে সামরিক নিরাপত্তা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাই বহু দশক ধরে কার্যকর ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট। অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম সামরিকীকৃত এলাকা হলেও নিরাপত্তাহীনতা কমেনি। বরং সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার হামলা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো আক্রমণ দেখিয়ে দিয়েছে, বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব সময় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
এখানেই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার গুরুত্ব সামনে আসে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিবহন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং উৎপাদন কাঠামো গভীরভাবে যুক্ত থাকে, তখন সংঘাতের দাম বেড়ে যায়। যুদ্ধ তখন শুধু সামরিক ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। কারণ ক্ষতির বোঝা শুধু প্রতিপক্ষের ওপর পড়ে না; নিজের বাজার, নিজের বিনিয়োগ, নিজের বন্দর, নিজের জ্বালানি সরবরাহ এবং নিজের নাগরিকরাও তার মূল্য দেয়।
উপসাগরীয় অঞ্চল এখন যে অবস্থায় আছে, তা অনেকটা বিপরীত বাস্তবতা। ভূগোল ও অর্থনীতি একে এক অঞ্চলে পরিণত করলেও রাজনীতি তাকে বিভক্ত করেছে। এই বিভক্তির সুযোগে প্রক্সি সংঘাত, অবকাঠামো ধ্বংস, সমুদ্রপথে উত্তেজনা এবং সীমিত আকারের আক্রমণ বারবার বড় আঞ্চলিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। কিন্তু হামলা শুরু করা পক্ষের জন্য সব সময় সেই ক্ষতি সমানভাবে ফিরে আসে না। ফলে সংঘাতের প্রণোদনা পুরোপুরি কমে না।
অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো হলে এই হিসাব বদলাতে পারে। যদি ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বন্দর সহযোগিতা, জ্বালানি অবকাঠামো, কৃষি, ওষুধশিল্প, পরিবহন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলোতে ধাপে ধাপে সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলে উত্তেজনা বাড়ানোর আগে প্রত্যেক পক্ষকে অনেক বেশি হিসাব করতে হবে। কারণ তখন অস্থিরতা মানে হবে শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়; সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি।
অনেকে বলবেন, এত বছরের অবিশ্বাসের পর ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়া অবাস্তব চিন্তা। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, আস্থা সব সময় সহযোগিতার আগে আসে না। অনেক সময় সহযোগিতাই ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করে। যখন নিয়মিত বাণিজ্য হয়, যৌথ প্রকল্প চলে, সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বয় হয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করা হয়, তখন যোগাযোগের পথ খোলা থাকে। আর যোগাযোগ খোলা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি, হঠাৎ উত্তেজনা বা সংকটের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমে।
যুদ্ধোত্তর ইউরোপের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। শতাব্দীর পর শতাব্দী সংঘাতের পর ইউরোপের দেশগুলো কৌশলগত শিল্প, বাজার ও উৎপাদন কাঠামোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। রাজনৈতিক মতবিরোধ একদিনে দূর হয়নি, কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক সংঘাতকে ধীরে ধীরে অযৌক্তিক করে তুলেছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলেও একই মডেল হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব না হলেও মূল শিক্ষা প্রাসঙ্গিক: স্থায়ী শান্তি শুধু চুক্তিতে নয়, পারস্পরিক স্বার্থের গভীর কাঠামোর মধ্যেই জন্ম নেয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাসও পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস নয়। একসময় ইরানি ও আরব বন্দরগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, অভিবাসন, অর্থায়ন এবং পারিবারিক যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। দুবাইয়ের বাণিজ্যিক উত্থানও আংশিকভাবে এই দীর্ঘদিনের আন্তঃউপসাগরীয় সংযোগের ওপর দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ বর্তমান শত্রুতার পরিবেশ স্থায়ী বা অনিবার্য নয়; বরং এটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল।
কাতার ও ইরানের মধ্যে যৌথ গ্যাসক্ষেত্র ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা দেখায় যে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। ওমানও বহু বছর ধরে ইরান ও আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, পূর্ণ রাজনৈতিক মীমাংসা ছাড়াও সীমিত ও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা শুরু করা যায়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্য, পুঁজি প্রবাহ এবং উন্মুক্ত নেটওয়ার্কের ওপর তাদের নির্ভরতা অনেক বেশি। তাই দীর্ঘমেয়াদে কঠোর ভূরাজনৈতিক বিভাজনের ওপর নিরাপত্তা দাঁড় করানো তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা যেমন ঝুঁকি কমাতে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করেন, তেমনি রাষ্ট্রগুলোরও নিরাপত্তার ভিত্তি বৈচিত্র্যময় করা দরকার। সামরিক মিত্রতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভও তৈরি করতে হবে।
প্রথম ধাপে বড় রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং কম ঝুঁকির ব্যবহারিক ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা শুরু করা যেতে পারে। যেমন সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, বন্দর পরিচালনা, অবকাঠামো সুরক্ষা এবং জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা। এসব বিষয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে এক। রাজনৈতিক খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু আস্থা তৈরির সম্ভাবনা বেশি।
দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত অর্থনৈতিক খাতগুলো খুলে দেওয়া যেতে পারে। কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, ওষুধশিল্প, লজিস্টিকস, সীমিত বিনিয়োগ সুরক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর প্রযুক্তিগত সমন্বয়—এসব খাত তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল। এগুলো সরাসরি সামরিক জোট তৈরি করে না, আবার পূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতার শর্তও আরোপ করে না। কিন্তু এগুলো ধীরে ধীরে এমন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে যেখানে সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য ক্রমেই বাড়বে।
পরবর্তী সময়ে এসব উদ্যোগ একটি স্থায়ী আঞ্চলিক ফোরামের ভিত্তি হতে পারে। সেই ফোরাম শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, সংকট ব্যবস্থাপনা, সমুদ্র নিরাপত্তা, অবকাঠামো রক্ষা এবং উত্তেজনা কমানোর প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করতে পারে। বাইরের মিত্ররাও এই প্রক্রিয়াকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে নিরাপত্তার সহায়ক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক সামরিক প্রতিরোধকে বাতিল করে না; বরং তাকে আরও কার্যকর করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মানেই আত্মসমর্পণ নয়। এটি কোনো আদর্শিক ছাড় নয়, বরং কৌশলগত বীমা। উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে হবে না, সব মতবিরোধ মিটিয়ে ফেলতে হবে না, কিংবা পুরোনো জোট ত্যাগ করতে হবে না। তাদের শুধু এমন বাস্তবতা তৈরি করতে হবে যেখানে সংঘাতের চেয়ে সহাবস্থান বেশি লাভজনক হয়।
বর্তমান যুগে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব একা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সস্তা প্রযুক্তি, অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল এবং অবকাঠামোভিত্তিক হামলার যুগে শক্তিশালী রাষ্ট্রও অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। তাই নিরাপত্তাকে শুধু অস্ত্রের গুদাম দিয়ে মাপা যাবে না। নিরাপত্তা মানে হবে বাণিজ্যিক সংযোগ, পারস্পরিক ক্ষতির হিসাব, সংকটের আগেই যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং যুদ্ধকে অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক করে তোলার ক্ষমতা।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তাই কেবল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সামরিক ঘাঁটি বা নতুন মিত্রতার ওপর নির্ভর করবে না। তা নির্ভর করবে এই অঞ্চলের দেশগুলো কতটা সাহসীভাবে পুরোনো বৈরিতার বাইরে গিয়ে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়তে পারে তার ওপর। ইরানকে বাদ দিয়ে উপসাগরীয় স্থিতিশীলতা নির্মাণ করা কঠিন। কিন্তু ইরানকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস না করেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাধ্যমে সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বন্ধুত্বের নয়, স্বার্থের। প্রশ্নটি আদর্শিক মিলের নয়, নিরাপত্তার নতুন গণিতের। যদি উপসাগরীয় দেশগুলো সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে—অস্ত্র সংঘাত ঠেকাতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা সংঘাতকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। আর এই বাস্তবতাই হয়তো আগামী দিনের উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে।

