- ভোটাধিকার হারিয়ে ‘অপমানিত’ প্রবীণ সাংবাদিক
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর এবার পাসপোর্ট নবায়নও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কলকাতার ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এর সাবেক সম্পাদক রাজাগোপাল রামদাস। সূত্র: বিবিসি
তিনি অভিযোগ করেছেন, ভোটাধিকার হারানোর ঘটনাটি একজন নাগরিকের জন্য সবচেয়ে অপমানজনক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “হঠাৎ করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া এবং ভোট দিতে না পারা একজন দেশের নাগরিকের কাছে এর চেয়ে অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না। ভোট দেওয়া একজন নাগরিকের সবচেয়ে পবিত্র অধিকার।”
তিনি আরো বলেন, “আমার মনে হচ্ছে যেন আমাকে নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে, আমি নাগরিক কি না। নিজেকে একজন অর্ধেক নাগরিক মনে হচ্ছে।”
কেরালায় জন্ম নেওয়া রাজাগোপাল রামদাস তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতায় বসবাস করছেন। কয়েক মাস আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তার নাম বাদ পড়ে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে কলকাতা পুলিশের একটি ‘অ্যাডভার্স রিপোর্ট’-এর কারণে তার পাসপোর্ট নবায়নও আটকে যায় বলে জানান তিনি।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মেয়ের বিয়েতে অংশ নিতে পারেননি তিনি, যদিও তার আগের পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছরের বৈধ ভিসা রয়েছে।
রাজাগোপাল রামদাস জানান, জুন মাসে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করার পর তাকে জানানো হয়, ভোটাধিকার নিয়ে ‘সন্দেহ’ থাকায় কলকাতা পুলিশ তার নামে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে তিনি বলেন, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, বরং পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তার ভাষ্য, পুলিশ জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করবে না।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোন আইন বা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, পাসপোর্টের জন্য ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
রাজাগোপাল রামদাস জানান, তিনি বায়োমেট্রিক তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দিয়েছেন। এরপরও তার আবেদন অনুমোদন বা বাতিল—কোনোটিই করা হয়নি। আগামী ১৭ জুলাই তাকে আবার পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভারতের সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস গিল্ড’ বিবৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভিডি সথিশন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি লিখে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার কারণে দেওয়া পুলিশি প্রতিবেদনের ফলে একজন প্রবীণ সাংবাদিকের পাসপোর্ট নবায়ন বিলম্বিত হওয়া উদ্বেগজনক।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি, এটি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অন্যদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও পর্যবেক্ষণে বলেছে, নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটার হিসেবে যোগ্যতা নির্ধারণ করা, নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা নয়।
কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত কমিশনার ধ্রুবজ্যোতি দে ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, একই ঠিকানার একাধিক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ায় একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পাসপোর্ট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভোটার পরিচয়পত্র একমাত্র বা চূড়ান্ত নথি নয় এবং সবকিছু ঠিক থাকলে আঞ্চলিক পাসপোর্ট দপ্তরে নতুন প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
গত বছরের অক্টোবরে ভারতের নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬০ লাখ ভোটার অতিরিক্ত যাচাইয়ের আওতায় আসেন এবং নির্বাচনের আগে ২৭ লাখের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। রাজাগোপাল রামদাসও তাদের একজন।
তিনি জানান, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন। তবে সেই আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
বর্তমানে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ সংগ্রহেই সময় কাটছে বলে জানান এই প্রবীণ সাংবাদিক। তিনি বলেন, সম্প্রতি নিজের জন্মসনদ পেলেও সেখানে মায়ের নামের বানানে অসঙ্গতি রয়েছে। সেই ভুল সংশোধনের জন্য তাকে মায়ের শিক্ষাজীবনের নথি, পুরোনো পরিচিতজন এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

